ভোটের সময় সবাই বলেন, সেতু হবে। অথচ ভোট শেষ হলে সেই সেতুর আর কোনো খোঁজ থাকে না—এমন আক্ষেপই এখন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার আগুরিয়া এলাকার মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। ৬০ বছর বয়সী আব্দুস সামাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, প্রায় ১৭ বছর ধরে তিনি শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে যাচ্ছেন, বাস্তবে কোনো স্থায়ী সেতু দেখেননি।
বেলকুচি উপজেলার আগুরিয়া এলাকায় যমুনা-সংযুক্ত আগুরিয়া নদীর ওপর ৩৫০ থেকে ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর দাবি স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখনো সেখানে কোনো স্থায়ী সেতু নির্মাণ হয়নি। ফলে আশপাশের অন্তত ২০টি গ্রামের প্রায় ২২ থেকে ২৩ হাজার মানুষ বছরের পর বছর ধরে নৌকা ও বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই চলাচল করছেন। বর্ষা মৌসুমে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পানি কমে যাওয়ায় আগুরিয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠেছে। নদী পারাপারের জন্য তৈরি করা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন নারী, শিশু ও বয়স্করা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। একটু অসাবধানতায় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হরিনাথপুর চর, বড়ইতলা, বেড়া খাওরুয়া, দসখাদা, মুলকান্দি, বাগভাংরা, নানাপুর চর ও বড়ধুলসহ আশপাশের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত নির্ভর করছে এই একটি বাঁশের সাঁকোর ওপর। শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া, কৃষকদের হাটে যাওয়া কিংবা অসুস্থ ও বয়স্কদের চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে এই সাঁকো পার হতে হয়।
নদীর ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না বলে জানান স্থানীয়রা। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয় স্থানীয় আড়তে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, শিক্ষার্থী ও বয়স্ক মানুষ।
প্রতিবছর নিজের উদ্যোগেই বাঁশের সাঁকোটি তৈরি করেন মাঝি হযরত আলী। তিনি জানান, প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে সাঁকোটি নতুন করে বানাতে হয়। গ্রামবাসীরা পারাপারের বিনিময়ে বছরে এক মণ ধান দেন। বাইরের কেউ পার হলে জনপ্রতি পাঁচ টাকা নেওয়া হয়।
হযরত আলী বলেন, ‘নদীর ওপর ব্রিজ না থাকলে মানুষ চলবে কীভাবে? নিজের টাকায় না বানালে এই গ্রামগুলো একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’
কৃষক সোনাউল্লাহ বলেন, ‘ফসল ফলালেও বাজারে নিতে পারি না। বাঁশের সাঁকো দিয়ে তো বড় যানবাহন চলতে পারে না। তাই কম দামে বিক্রি করতে হয়, লোকসান গুনে যেতে হচ্ছে।’
বৃদ্ধ আব্দুস সামাদ বলেন, ‘বয়স হয়েছে। বাঁশের সাঁকো পার হতে গেলেই ভয় লাগে। ভোটের সময় সবাই আসে, কিন্তু ভোট শেষে কেউ আর ফিরে তাকায় না।’
এলাকার একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার প্রতিশ্রুতি ভাঙায় তাঁদের অনেকেরই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজাপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাবিব খাঁন বলেন, ‘অনেকবার আবেদন করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে সেতু নির্মাণের চেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত সফল হওয়া যায়নি।’
বেলকুচি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান বলেন, ‘কয়েকটি সেতুর তালিকা জেলা প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’
জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউর রহমান বলেন, ‘৭৫টি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তালিকায় থাকলে কাজ হবে, না থাকলে পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
আরএস
No comments yet. Be the first to comment!