ধর্ম

আল্লাহর জিকির যেভাবে অন্তরকে প্রশান্ত করে

আপডেট: জানু ০৭, ২০২৬ : ০৫:০২ এএম
আল্লাহর জিকির যেভাবে অন্তরকে প্রশান্ত করে

ইসলামে সহজ কিন্তু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো আল্লাহর জিকির। কোরআন ও হাদিসে জিকিরকে সর্বোত্তম এবং সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহকে স্মরণ করার মধ্যেই রয়েছে হৃদয়ের প্রশান্তি, আত্মার শক্তি ও জীবনের ভারসাম্য।

আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের সর্বোত্তম আমল, তোমাদের প্রতিপালকের কাছে সবচেয়ে পবিত্র ও মর্যাদাবর্ধক কাজের কথা জানাব না? যা সোনা–রূপা দান করা এবং শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধের চেয়েও উত্তম।”
সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই।’
নবীজি (সা.) বললেন, “আল্লাহ তায়ালার জিকির।”
—সুনানে তিরমিজি

কোরআনের ঘোষণা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—
“জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
(সূরা রা‘দ: ২৮)

আলেমদের মতে, মানুষের জীবনের দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতার বড় কারণ আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা। নিয়মিত জিকির অন্তরের অস্থিরতা দূর করে এবং হৃদয়ে এক অনন্য প্রশান্তির সৃষ্টি করে।

জিকিরের বহুমুখী উপকারিতা

আলেম ও তাফসিরকাররা বলেছেন, জিকিরের উপকারিতা অসংখ্য। এর মাধ্যমে—

  • আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হন

  • শয়তান দূরে থাকে

  • দুশ্চিন্তা ও হতাশা কমে

  • হৃদয়ে আনন্দ ও প্রশান্তি আসে

  • আত্মিক শক্তির পাশাপাশি শারীরিক শক্তিও বৃদ্ধি পায়

তাঁদের মতে, যারা নিয়মিত জিকির করেন, তাঁদের সময়ের মধ্যে বরকত আসে। অল্প সময়েই তারা বেশি কাজ করতে সক্ষম হন।

কোরআনের আলোকে শক্তি বৃদ্ধির কথা

কোরআনের এক আয়াতে নবী হুদ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেন,
“তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁর দিকে ফিরে আসো। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির ওপর আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন।”
(সূরা হুদ: ৫২)

তাফসিরকাররা বলেন, আদ জাতি এমনিতেই শক্তিশালী ছিল। আল্লাহ তাদের ঈমান ও আনুগত্যের বিনিময়ে আরও শক্তি ও সামর্থ্য বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

হজরত ফাতিমা (রা.)-এর ঘটনা

জিকিরের বাস্তব প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো হজরত ফাতিমা (রা.)-এর ঘটনা। গৃহস্থালির কাজ করতে গিয়ে তিনি শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর কাছে একজন খাদেম চেয়েছিলেন। তখন নবীজি (সা.) তাকে খাদেম না দিয়ে ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট কিছু জিকির শেখান এবং বলেন,
“এটি তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়েও উত্তম।”

ইবনে কাইয়্যিম ও ইবনে তাইমিয়ার উদাহরণ

বিশিষ্ট আলেম ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, যারা নিয়মিত ওই জিকির আদায় করে, তারা দিনের কাজে এমন শক্তি অনুভব করে—যা একজন খাদেমের অভাব পূরণ করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, তিনি নিজ চোখে তাঁর শিক্ষক শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার অসাধারণ কর্মক্ষমতা দেখেছেন। দিনে তিনি যে পরিমাণ লেখা লিখতেন, তা সাধারণ লেখকের পক্ষে এক সপ্তাহেও লেখা কঠিন। যুদ্ধক্ষেত্রেও তাঁর মানসিক দৃঢ়তা সবাইকে বিস্মিত করেছিল।

একদিন ফজরের নামাজের পর দীর্ঘ সময় জিকিরে মশগুল থাকার পর ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন,
“এটাই আমার দিনের নাশতা। এটি না পেলে আমার শক্তি ভেঙে পড়ত।”

কেন প্রয়োজন জিকির

আলেমদের মতে, জিকির শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি অন্তরের আমল। নিয়মিত ও মনোযোগের সঙ্গে আল্লাহর জিকির করলে জীবনের ক্লান্তি হালকা হয়, অন্তর দৃঢ় হয় এবং মানুষ আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখে।

এই ব্যস্ত ও উৎকণ্ঠাপূর্ণ সময়ে আল্লাহর জিকিরই হতে পারে অন্তরের প্রশান্তি ও আত্মিক শক্তির প্রকৃত উৎস।

 

আরএস

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!