অর্থনীতি

সুশাসনের ঘাটতিতে লুটপাটের শিকার হয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং: গভর্নর

আপডেট: জানু ১০, ২০২৬ : ০৫:২৭ পিএম
সুশাসনের ঘাটতিতে লুটপাটের শিকার হয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং: গভর্নর

সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং খাত লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, নীতিগতভাবে ইসলামী ব্যাংকিংকে সবচেয়ে নিরাপদ ঋণব্যবস্থা হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশে এর সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এই খাতে বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুযোগ নিয়েছে।

আজ শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সম্মেলন’-এর দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন গভর্নর। দুদিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে ইসলামী ব্যাংকিংকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে শরীয়াহ নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং কিছু গোষ্ঠীর দখলদারির কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম বেড়েছে। এর ফলে গ্রাহক ও আমানতকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেন, এই অনিয়মের দায় কোনো একক পক্ষের নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও শরীয়াহ বোর্ড—সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে আমানতকারীরাও তাদের অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশ্ন তোলেননি।

গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের এক চতুর্থাংশেরও বেশি অংশ ইসলামী ব্যাংকগুলোর দখলে। সচেতনতার কারণেই জনগণ ইসলামী ব্যাংকিং বেছে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ খাত আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে শরীয়াহভিত্তিক বন্ড বা সুকুক বাজার গড়ে তোলা জরুরি।

গভর্নর আরও বলেন, দেশের মোট আর্থিক সম্পদের বড় একটি অংশ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আওতায় থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বও বেড়েছে। এসব সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের ন্যায্য মুনাফা দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য।

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে উল্লেখ করে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশে অন্তত দুটি শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা কমেনি। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি আমানত এসেছে এই খাতেই। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সহায়তার অর্থ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ফেরত দিয়েছে।

ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, এ লক্ষ্যে একটি নতুন ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। শরীয়াহ বোর্ডের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শরীয়াহ বোর্ডকে হতে হবে শক্তিশালী ও সাহসী। চাকরি হারানোর ভয় করে দায়িত্ব পালনে আপস করা যাবে না।’

সবশেষে গভর্নর বলেন, দেশে আর কোনো আর্থিক লুটতন্ত্র ফিরে আসতে দেওয়া হবে না। ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে বিশ্বে অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


আরএস

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!