অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিগত সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া চ্যালেঞ্জিং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতা দেখিয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ব্যাংকিং অ্যালম্যানাক’-এর সপ্তম সংস্করণের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশ একটি ভঙ্গুর ম্যাক্রো অর্থনৈতিক অবস্থা পেয়েছিল। তবে বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি ধরনের স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। মূল্যস্ফীতি এখনও সংবেদনশীল ইস্যু হলেও তা কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বাজারে শৃঙ্খলা এবং ব্যবসায়ী, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের সম্মিলিত সহযোগিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত মুনাফালোভ ও মজুতদারি শুধু আইন প্রয়োগ করে দমন করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নীতিনির্ধারক, বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্জন ও চ্যালেঞ্জগুলো ভারসাম্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। ধারাবাহিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ আরও শক্তিশালী ও সম্মানজনক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
অনুষ্ঠানে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত, প্রভিশনিং, ঋণ প্রবৃদ্ধি, সঞ্চিত মুনাফা ও ঋণ-আমানত অনুপাতের মতো সূচকগুলো বর্তমান চাপ ও চলমান সমন্বয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তাঁর ভাষায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি এখনও চ্যালেঞ্জিং হলেও তথ্য-উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে।
মুদ্রানীতির বিষয়ে তিনি বলেন, সুদের হার কমানো একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে ট্রেজারি বিলের সুদহার, ব্যাংক আমানতের হার ও তারল্য ব্যবস্থাপনা জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বিলের সুদহার কমলেও এর পূর্ণ প্রভাব বাজারে পড়তে সময় লাগে। ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ সরকারি বিনিয়োগে অতিরিক্ত ঝোঁক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এটি এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষ বাজার নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি দীর্ঘদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং কৃষিপণ্যের দামের বিকৃতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তিনি অতিরিক্ত নেতিবাচক প্রচারণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ধরনের প্রচারণা আস্থা ও দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। নীতিনির্ধারণ কখনোই জনপ্রিয়তাবাদ বা সংকীর্ণ স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সামগ্রিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের বোর্ড অব এডিটরসের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং প্রকল্প পরিচালক আবদার রহমান বইটির পরিচিতি তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্যাংকিং অ্যালম্যানাকের বোর্ড অব এডিটরসের সদস্য মোহাম্মদ নুরুল আমিন ও এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান।
আরএস
No comments yet. Be the first to comment!