ব্যাংক কোম্পানিতে ব্যক্তি, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণের ওপর সীমা আরোপের উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তুলেছেন ব্যাংক মালিকেরা। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাব করেছে, কোনো ব্যক্তি, তার পরিবারের সদস্য বা কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে একাধিক ব্যাংকে একযোগে ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব কমাতেই এই বিধান যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে মতামত গ্রহণের জন্য গত বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি সভা আয়োজন করে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সেখানে ব্যাংক কোম্পানি আইন–২০২৫-এর ১৪খ ধারায় নতুন করে তিনটি উপধারা যুক্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন একাধিক ব্যাংকের ওপর একসঙ্গে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, একই ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান এককভাবে বা যৌথভাবে একাধিক ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার রাখতে পারবে না। কোনো ব্যাংকে যদি কেউ মোট শেয়ারের ২ শতাংশ বা তার বেশি ধারণ করে, তাহলে একই সময়ে অন্য কোনো ব্যাংকে ২ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার রাখার সুযোগ থাকবে না।
এ ছাড়া সরকার, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে ভোটাধিকার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি কোনো ব্যাংকের ৫ শতাংশের বেশি শেয়ারও ধারণ করে, তবু তার ভোটাধিকার ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকবে। বর্তমানে বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে একাধিক ব্যাংকের শেয়ার ধারণে তেমন বাধা নেই। সাধারণভাবে একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার রাখতে পারেন এবং সেখানে ‘এক শেয়ার, এক ভোট’ নীতি কার্যকর রয়েছে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর প্রতিনিধিরা প্রস্তাবিত শেয়ার ধারণ সীমার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি, সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেন না; প্রকৃত প্রভাব থাকে পরিচালনা পর্ষদের হাতে। যেহেতু পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব আগেই দেওয়া হয়েছে, তাই আলাদাভাবে ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণ সীমিত করার যৌক্তিকতা নেই বলে মত বিএবির।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সভায় বলেন, একটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী একসঙ্গে ছয়টি ব্যাংকের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার ধারণ করে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। উল্লেখযোগ্য শেয়ার ও নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে তারা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং সেখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এর ফলে লক্ষাধিক আমানতকারী বিপাকে পড়েছেন। তারা জানান, গত বছরের শেষ দিকে একীভূত করা পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা জনগণের অর্থ থেকে ব্যয় করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রস্তাবিত আইন সংশোধনী চূড়ান্ত করতে আরও সময় প্রয়োজন। একাধিক ব্যাংকে ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণ সীমা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএবির মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। পরবর্তী সভায় উভয় পক্ষকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএবি তাদের প্রস্তাবে পরিবার বলতে স্বামী–স্ত্রী ও নির্ভরশীল সদস্যদের বোঝানোর কথা বলেছে। একই পরিবারের সর্বোচ্চ শেয়ার ধারণের সীমা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিএবির মতে, পরিবার ধারণা অতিরিক্ত বিস্তৃত করা হলে প্রকৃত উদ্যোক্তা পরিবারগুলো অকারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। তাই আইন সংস্কারের ক্ষেত্রে অযথা কঠোরতা আরোপ না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!