বাংলাদেশের সঙ্গে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে চুক্তিটি বাতিলের লক্ষ্যে সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সরকার গঠিত পর্যালোচনা কমিটি। চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত থেকে আটজন ব্যক্তির অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে কমিটি।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান। কমিটি গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আগে আদানিকে জানিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। এরপর দ্রুত সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেরি হলে আইনি জটিলতার কারণে মামলার অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে লন্ডনের আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় এ ধরনের তথ্য খুবই বিরল।
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত থেকে আটজন ব্যক্তির অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলার। সংশ্লিষ্টদের ভ্রমণসংক্রান্ত নথিসহ বিভিন্ন তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। দুদক ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনো হিসাবে এ ধরনের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার অন্যান্য উৎস থেকে যে দামে বিদ্যুৎ কিনেছে, তার তুলনায় আদানির কাছ থেকে প্রতি ইউনিটে ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। ভারতের গ্রিড থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের তুলনায়ও আদানির বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তি অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। স্থান নির্বাচন, দাম নির্ধারণ এবং বিভিন্ন শর্ত আরোপ—সবকিছু মিলিয়ে এটি দুর্নীতির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে বলে মত দিয়েছে কমিটি। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ভারতের গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ আমদানির দাম যখন ছিল প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৮ সেন্ট, তখন আদানির ক্ষেত্রে তা নির্ধারণ করা হয় ৬ দশমিক ৮ সেন্ট, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে।
চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে আদানির কোনো ক্ষতি হলে তার দায় বহন করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। সব অর্থ পরিশোধ করতে হবে ডলারে এবং মাসিক সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এদিকে আদানি পাওয়ার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে তারা কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পায়নি এবং প্রতিবেদনটির কপি তাদের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে তারা নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করতে পারছে না। একইসঙ্গে তারা দাবি করেছে, বাংলাদেশের কোনো কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে মতামত বা তথ্যও চায়নি।
বিবৃতিতে আদানি পাওয়ার আরও জানায়, তারা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং বর্তমানে দেশের প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করে আসছে। বড় অঙ্কের বকেয়া পাওনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। তবে দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না হলে তাদের কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে কোম্পানিটি।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!