বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আর্থিক অবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছে বিশেষ আইনাধীন বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটি। ২০১৫ সালে যেখানে পিডিবির লোকসান ছিল সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। কমিটির মতে, ধারাবাহিক লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হচ্ছে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা। অথচ গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হচ্ছে গড়ে ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। শুধু টিকে থাকার হিসাব ধরলেও বিদ্যুতের মূল্য অন্তত ৮৬ শতাংশ না বাড়ালে পিডিবির পক্ষে লোকসান সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিশেষ বিধান আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তির কারণে পিডিবিকে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৫০ শতাংশ, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে ৪৫ শতাংশ এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিশেষ বিধান আইন ব্যবহারের আড়ালে বিদ্যুৎ ক্রয় ও চুক্তি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে রাষ্ট্র দখলের রূপ নিয়েছে। এতে নীতিনির্ধারণ ও চুক্তি প্রণয়ন সীমিত সংখ্যক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সার্বভৌম গ্যারান্টি ও আন্তর্জাতিক সালিশি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, অথচ দেশের বাইরে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আদানি) ঝুঁকির দায়ও বাংলাদেশকেই নিতে হচ্ছে। গ্যাস মজুত সংকটের পরও একই এলাকায় সামিট গ্রুপকে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিটি।
কমিটির মতে, শুধু বিশেষ বিধান আইন বাতিল করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ওই আইনের আওতায় সম্পাদিত আদানি চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি অন্যান্য চুক্তিও পুনরায় পর্যালোচনা করা জরুরি। সব চুক্তি নয়, যেগুলোর কারণে আর্থিক ‘রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে, সেগুলো নতুন করে পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে তারা।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে বিদ্যুৎ খাতে সংকট স্থায়ী রূপ নেবে। লোকসান ও ভর্তুকি বাড়তেই থাকবে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিবসহ অন্যরা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!