নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রুক্সী আহমেদ। পেশা হিসেবে না নিলেও শিক্ষক হয়েও গান করেছেন শতভাগ পেশাদারির সঙ্গে। ১৯৯৫ সালে লালমাটিয়া মহিলা কলেজে যোগদান করেন রুক্সী। ২৮ বছরের অধিক সময় ধরে তিনি শিক্ষকতা করছেন। কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন এবং বর্তমানে এই কলেজেরই ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।
রুক্সী জানালেন, ‘‘তিনি শুরু থেকেই শিক্ষকতার পাশাপাশি গান গেয়েছেন। ১৯৯১ সালে তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘সেই চেনা মুখ’ প্রকাশিত হয়। তারপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে কলেজে ঢোকেন। ১৯৯৫ সালে প্রভাষক হিসেবে চাকরিতে ঢোকার বছরই তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘মনচোরা’ প্রকাশ হয়।’’
কখনোই গান ও পেশা এ দুটোর সংঘর্ষ হয়নি। এখন গান থেকে কিছুটা দূরে থাকার কারণ শুধুই চাকরি নয়। ক্যাসেট থেকে সিডি হলো। সিডি থেকে এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। গানের জগতে যে অবিরাম পরিবর্তন, এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোন মাধ্যমে কীভাবে গান করা যায়, তা নিয়ে ভাবতেই সময় বয়ে গেছে তাঁর।
রুক্সীর মা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। চাকরি করেও মাকে সময় দিতে হয়েছে তাঁর। তারপর ২০১৪ সালে মা মারা গেলেন। একটা সময় রুক্সীকে গানের জগতে দৌড়ঝাঁপের ব্যাপারে মা সাহায্য করতেন। এটা বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাসেটের যুগে পাটুয়াটুলীতে সব অডিও কোম্পানি ছিল। এটা ছিল রুক্সীর জন্য সুবিধার। সব কোম্পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়ায় এগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও আগের মতো মসৃণ নেই তাঁর। তার পরও তিনি গান ছাড়েননি। এখনো নিয়মিত স্টেজ শো করেন। শেষ কনসার্ট করেছেন জাপানে। করোনার কারণে বাতিল হয়েছে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও মালয়েশিয়ার কনসার্টগুলো।
চ্যানেলে গাওয়া হয় না প্রসঙ্গে রুক্সী বলেন, ‘মিউজিশিয়ান ভালো না হলে, আয়োজন ঠিকঠাক না থাকলে ‘লাইভে’ গাইতে চান না তিনি। এসব অনুষ্ঠানে অন্য শিল্পীদের গান গাওয়ার চাপ থাকে। অথচ তাঁর নিজের গাওয়া মৌলিক গানের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০। রুক্সী বললেন, ‘আমাদের নব্বইয়ের দশকের শিল্পীদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর উচিত আমাদের গানগুলো গাওয়ার সুযোগ দেওয়া। আমি রুক্সী আমার নিজের দশটা গান গাইব, এটাই স্বাভাবিক। আমরা যারা এত কষ্ট করে মৌলিক গান গেয়ে এ জায়গায় এসেছি, তাদের অন্য শিল্পীর গান গাইতে বললে দুঃখ লাগে। এ জন্য আমি অনেক সময় লাইভ প্রোগ্রামে যাই না। আর গেলেও আগে জিজ্ঞেস করে নিই, তোমারা কি আমাকে নিজের গান গাওয়ার সুযোগ দেবে?’
প্রায় ৩৫ বছরের ক্যারিয়ারে ৭-৮টা একক অ্যালবামে গেয়েছেন রুক্সী। ১৪-১৫টা মিশ্র অ্যালবামে গেয়েছেন। প্রায় ১০০ সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন। জিঙ্গেলও করেছেন শখানেক। অসংখ্য গান গেয়েছেন টিভিতে ও বেতারে। প্রায় ২০টি দেশে স্টেজ শো করেছেন। তাঁর মৌলিক গানের সংখ্যা ৫০০-র কাছাকাছি। যার মধ্যে জনপ্রিয় কিছু গান ছাড়া অনেক গানই কম প্রচারিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এসব গানের মধ্য থেকে শ’খানেক গান বাছাই করে নতুনভাবে প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে তাঁর। নতুন মাধ্যমে পুরোনো রেকর্ড করা গানগুলো শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে চান তিনি। গান নিয়ে এটাই আপাতত পরিকল্পনা নব্বইয়ের দশকের আলোচিত কণ্ঠশিল্পী রুক্সী আহমেদের।
একনজরে রুক্সী আহমেদ
*জন্মস্থান: রাজশাহী
*শিক্ষা: বি.এ অনার্স ও এম. এ (ইংরেজি বিভাগ),ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
*প্রথম শাস্ত্রীয় সংগীতে হাতেখড়ি: ১৯৭৯ সাল *প্রথম সংগীত শিক্ষক: শেখ আব্দুল আলীম
*পরবর্তী সংগীত শিক্ষক: সুধীন দাশ এবং খন্দকার নুরুল আলম।
*বেতার এবং টিভিতে শিল্পী হিসেবে প্রথম সঙ্গীত পরিবেশনা: রাজশাহী বেতারে শিশুশিল্পী হিসেবে শিশুমেলা অনুষ্ঠানে ১৯৮০ সালে। *টিভি ও বেতারে পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্তি: ১৯৯১ সালে ।
প্রথম প্রকাশিত সংগীত অ্যালবাম: সেই চেনা মুখ(১৯৯১ সাল)। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ভাষাযোদ্ধা মমিনুল হক।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান: রোজ ভ্যালি।
দ্বিতীয় প্রকাশিত সংগীত অ্যালবাম: মন চোর (১৯৯৫)।
পরবর্তীতে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য অ্যালবামসমূহ: ইশারা, প্রেমপত্র, এরই নাম ভালোবাসা, বাহানা, রূপকথা, আনচান এবং ঘাসফুলের মালা। আরো বেশ কয়েকটি মিক্সড অ্যালবাম।
অ্যালবামে উল্লেখযোগ্য সংগীত পরিচালক: মান্নান মোহাম্মদ, প্রণব ঘোষ এবং হাসান মতিউর রহমান সহ অনেকে।
চলচ্চিত্রে কণ্ঠ গান: প্রায় ৮০টি গানে
বিভিন্ন জিঙ্গেল/ বিজ্ঞাপনচিত্রের কন্ঠদান: প্রায় শতাধিক।
চলচ্চিত্র এবং বিজ্ঞাপনচিত্রের উল্লেখযোগ্য সংগীত পরিচালক: আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আবু তাহের, আইয়ুব বাচ্চু, মাজহারুল ইসলাম এবং রিপন খান।
সংগীত পরিবেশন এর জন্য বিদেশ গমন: এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকার প্রায় ৩০ টি দেশে
রুক্সী বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিশেষ শ্রেণীর সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত।
আগামী পরিকল্পনা:বেশ কিছু মৌলিক ভালো গান গাওয়া, নিজের গাওয়া আগের গানগুলো নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!