জাপানে সুদের হার বাড়ানোর পথে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী শুক্রবার ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) সুদের হার বাড়ানোর ঘোষণা দেবে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশটিতে সুদের হার পৌঁছাবে গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এতে জাপানের ঋণবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বাজেট শৃঙ্খলা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জাপানি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার (ইল্ড) বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েন আরও দুর্বল হয়েছে। সাধারণভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ালে বন্ডের আকর্ষণ বাড়ে। এতে বন্ডের দাম কমলেও তার বিপরীতে ইল্ড বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের বন্ডবাজারেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জাপানের অর্থনীতি ০ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। তবে ব্যাংক অব জাপানের গভর্নর কাজুও উয়েদা গত সপ্তাহে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–কে বলেন, মার্কিন শুল্কের প্রভাব যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটা ভয়াবহ হয়নি। তাঁর মতে, মার্কিন কোম্পানিগুলো শুল্কের চাপ নিজেরাই বহন করছে, যার প্রভাব এখনো ভোক্তা পর্যায়ে বড়ভাবে পড়েনি। এদিকে জাপানে মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। গত অক্টোবর মাসে দেশটির মূল ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ শতাংশ।
ফিচ সলিউশনসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিএমআই এক নোটে বলেছে, নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারছেন যে সুদের হার বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হয়ে ওঠার আগেই তাদের এই পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ সুদহার
ব্লুমবার্গের এক জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের ধারণা, ব্যাংক অব জাপান তাদের মূল সুদের হার ০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ০ দশমিক ৭৫ শতাংশ করতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে ১৯৯৫ সালের পর দেশটিতে সুদের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
দীর্ঘদিন নেতিবাচক (নেগেটিভ) সুদের হারের নীতি অনুসরণের পর ২০২৪ সালের মার্চ থেকে জাপান সুদের হার বাড়ানো শুরু করে। এ সময় জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সুদের হার বাড়াচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ উল্টো পথে হেঁটে সুদের হার কমাচ্ছে।
জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সুদের হার বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকাইচি চান না তাঁর পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে। ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের কারণে জনরোষের মুখে পড়ে ইশিবা নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিলেন।
গত সপ্তাহে জাপানের নিম্নকক্ষে ১৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ১১৮ বিলিয়ন ডলার) সমপরিমাণ একটি অতিরিক্ত বাজেট অনুমোদন পেয়েছে। সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার কমাতে বড় আকারের এই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসবে ঋণ নিয়ে। এতে জাপানের আর্থিক খাতের স্বাস্থ্য নিয়ে বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর দেশটির ঋণ জিডিপির ২৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ইতিমধ্যেই এর প্রভাব বাজারে স্পষ্ট। ডিসেম্বরের শুরুতে ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। একই সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ডও গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ তাকাহিদে কিউচি বলেন, এসব কারণে সরকারের অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজের ইতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে বাজারের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বর্তমান প্রশাসনের আর্থিক নীতির একটি বড় দুর্বলতা।
সূত্র: এএফপি
আরএস
No comments yet. Be the first to comment!