ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তাঁর আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) নিউইয়র্ক টাইমস–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষকে আঘাত করতে চাইছি না।’ তাঁর এই মন্তব্য এসেছে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বিস্ফোরণ, সামরিক ঘাঁটিতে হামলা ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের খবর ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় ওঠার পরপরই।
সমালোচকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি নিষিদ্ধ।
এই হামলাকে ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলেও মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই অভিযান চালানো হলো, যখন গত মাসেই ট্রাম্প উদ্বোধনী ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ গ্রহণ করেছিলেন।
হামলার পর ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করবে এবং দেশটির বিপুল তেলসম্পদ ব্যবহার করবে। যদিও তাঁর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সহযোগিতার পথেই এগোবে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের নীতিগত ‘নির্দেশনা’ মানতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
রোববার দ্য আটলান্টিক–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ডেলসি রদ্রিগেজকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তিনি যদি সঠিক কাজটি না করেন, তবে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে—সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প কলম্বিয়ার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে তিনি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচারণাও জোরদার করেন। এর আগে গত জুনে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্ত হয়ে দেশটির তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে পশ্চিম গোলার্ধে নিজের স্বার্থ রক্ষায় ‘নিঃসংকোচে’ সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে। সোমবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিলার বলেন, ‘আমরা একটি পরাশক্তি, আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করব।’
তবে আন্তর্জাতিক আইন ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, আন্তর্জাতিক আইনকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যানের এই প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বব্যবস্থার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার মার্গারেট স্যাটারথওয়েট বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অস্বীকার করে দেওয়া মার্কিন বক্তব্যগুলো ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
আরএস
No comments yet. Be the first to comment!