যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার শীর্ষে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় পরবর্তী ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি–এর নাম।
ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তেহরান।
লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রভাবশালী
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা কখনো নির্বাচনে অংশ নেননি, জনসমক্ষে বক্তৃতাও খুব কম দিয়েছেন। অনেক ইরানি নাগরিক তাঁর কণ্ঠস্বরও শোনেননি বলে স্থানীয় বিশ্লেষকদের মন্তব্য। তবু গত দুই দশক ধরে তিনি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–এর প্রভাবশালী অংশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা রয়েছে।
সমালোচকেরা বলেন, তিনি পেছন থেকে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছেন; সমর্থকেরা দাবি করেন, তিনি কেবল ধর্মীয় ও প্রশাসনিক পরামর্শ দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কোনো নির্বাহী পদ নেই।
বিতর্ক ও ‘ধর্মীয় রাজবংশ’–এর শঙ্কা
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে রাজতন্ত্র উৎখাত করে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সেখানে পিতার পর পুত্রের ক্ষমতায় আসা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী মহলের ভাষ্য, এতে ‘ধর্মীয় রাজবংশ’ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠতে পারে, যা সাবেক পাহলভি রাজবংশ–এর স্মৃতি উসকে দেয়।
বিক্ষোভ দমন ও ২০০৯ সালের আন্দোলন
সংস্কারপন্থী রাজনীতিকেরা মোজতবার বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বিক্ষোভ দমনে প্রভাব রাখার অভিযোগ তুলেছিলেন। সে সময় আধাসামরিক ‘বাসিজ’ বাহিনী মোতায়েনের বিষয়েও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে সমালোচকদের দাবি। যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে তাঁর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ইরান–ইরাক যুদ্ধে তিনি আইআরজিসি–সংশ্লিষ্ট একটি ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর সমসাময়িক অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। পশ্চিমা কয়েকটি প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ছদ্মনামে বিভিন্ন ব্যবসা ও আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
ধর্মীয় মর্যাদা ও সাংবিধানিক প্রশ্ন
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে উচ্চতর ধর্মীয় মর্যাদা—‘আয়াতুল্লাহ’—থাকা বাঞ্ছনীয়। মোজতবা বর্তমানে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ পদমর্যাদার আলেম হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও অনুরূপ বিতর্ক ওঠে এবং পরে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হয়। ফলে প্রয়োজনে আবারও আইনি বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
নির্বাচন প্রক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
ইরানের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করে। বর্তমান সংকটকালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম দেখভাল করছে। তবে দেশজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যোগাযোগব্যবস্থার বিঘ্নে প্রক্রিয়াটি কত দ্রুত এগোবে, তা স্পষ্ট নয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মোজতবা খামেনি দায়িত্ব পেলে প্রশাসনে কট্টরপন্থী প্রভাব আরও দৃঢ় হতে পারে এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অভিজাতদের ঐকমত্যের ওপর।
সূত্র: আল-জাজিরা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!