এম এ হামিদ
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ আর কেবল ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচন কিংবা দলীয় দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রমে রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর তথ্যযুদ্ধে-যেখানে সত্য নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী নির্মিত বয়ান, অর্ধসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাই হয়ে উঠছে প্রধান হাতিয়ার। এই ভুল তথ্যের বিস্তার এবং সেটিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ঋণাত্মক ও নির্ণায়ক সময়পর্বগুলো সম্পর্কে একটি পুরো প্রজন্মের উপলব্ধি মারাত্মকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক রেহমান সোবহানের সতর্ক উচ্চারণ-“একটি প্রজন্ম যদি ইতিহাস ভুলভাবে শেখে, তবে তারা রাষ্ট্রকে ভুলভাবে বোঝে”-আজ আর তাত্ত্বিক মন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের বাস্তবতা।
ইনকিলাব মঞ্চের আহবায়ক শরিফ ওসমান হাদীর শহিদি প্রয়াণে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় একটি গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব কেবল শোক বা প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই মৃত্যু দ্রুতই একটি রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নিয়েছে-যেখানে একদিকে তা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, অন্যদিকে ভুল তথ্য, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাদিকে ঘিরে বিপরীতমুখী বয়ান তৈরি হয়েছে-কেউ তাকে নিপীড়নের শিকার হিসেবে দেখাচ্ছে, কেউ আবার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে-ফলে সত্য অনুসন্ধানের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে রাজপথে ও সমাজে: প্রতিবাদ ও ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে, এবং তরুণ প্রজন্ম আবেগ ও বিভ্রান্তির দ্বন্দ্বে আটকে গেছে। সর্বোপরি, হাদির মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে-রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষ তথ্যপ্রবাহের প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে।
পাশাপাশি হাদীর স্ত্রী ও সন্তানের জীবনে নেমে এসেছে এক নীরব কিন্তু গভীর ট্র্যাজেডি, যা আমাদের রাজনীতির মানবিক দিকের ব্যর্থতাকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে। একজন রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নেওয়ার মুহূর্তেই হাদি একজন স্বামী ও পিতা হিসেবে আড়ালে চলে গেছেন, অথচ তার স্ত্রী ও সন্তানের কাছে তিনি প্রথমত একজন পরিবারপ্রধান, একজন আশ্রয়। রাষ্ট্র ও রাজনীতি যেখানে এই মৃত্যুকে নিজেদের বয়ান তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে, সেখানে ওই পরিবারটি রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাদিকে নিয়ে চরম ভাষা, বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ালেও খুব কমই আলোচিত হচ্ছে-এই মৃত্যু একটি শিশুর কাছ থেকে বাবাকে কেড়ে নিয়েছে, একজন নারীর কাছ থেকে স্বামীকে কেড়ে নিয়েছে, এবং তাদের ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে। এই নীরব মানবিক বিপর্যয়ই আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম দিকটি উন্মোচন করে: যেখানে মৃত্যু রাজনীতির প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সেই মৃত্যুর বোঝা বহন করতে হয় নিঃশব্দে একটি পরিবারকে-যাদের ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সত্য জানার অধিকার রাষ্ট্র এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সহিংসতার সঙ্গে ভুল তথ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির Computational Propaganda Project তাদের “Global Disinformation Order” গ্রন্থে দেখিয়েছে, ২০১৬ সালের পর থেকে ৮০টির বেশি দেশে সরকার ও রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ব্যবহার করেছে জনমত নিয়ন্ত্রণের জন্য। দক্ষিণ এশিয়া-বিশেষত বাংলাদেশ-এই তালিকায় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা, মৃত্যুর ঘটনা ও গণবিক্ষোভগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি তথ্যসংকটের বিস্ফোরণ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা বহুবার দেখেছি, রাজনৈতিক ঘটনা মূল্যায়নের আগেই বয়ান নির্মাণ শুরু হয়ে যায়। সত্য অনুসন্ধান এখানে দ্বিতীয় ধাপে পড়ে। হাওয়ার্ড জিন তার বিখ্যাত গ্রন্থ A People’s History of the United States-এ লিখেছিলেন, “Power not only controls resources, it controls memory.” বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ‘মেমোরি কন্ট্রোল’-এর চর্চা নতুন নয়। এক সময় সামরিক শাসনের বৈধতা দিতে ইতিহাস পাল্টানো হয়েছে, আবার অন্য সময় গণআন্দোলনের ভূমিকাকে একপেশে করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ড. বদরুদ্দীন উমরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সিরিজ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, কীভাবে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনীতি বারবার ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “ইতিহাস এখানে গবেষণার বিষয় না হয়ে দলীয় প্রচারণার অংশে পরিণত হয়েছে।” এর ফল আজ ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান-বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
আজকের তরুণরা ইতিহাস শেখে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। ইউনেস্কোর Global Media and Information Literacy Report অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৬৫ শতাংশ তরুণ রাজনৈতিক তথ্য প্রথমে পায় সামাজিক প্ল্যাটফর্ম থেকে, যেখানে যাচাইয়ের সুযোগ প্রায় নেই। বাংলাদেশে এই হার আরও বেশি। ফলে ইতিহাস আর পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; এটি ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব শর্টস এবং ভাইরাল স্লোগানে রূপ নিয়েছে।
ভুল তথ্যের এই পরিবেশে যে কোনো রাজনৈতিক মৃত্যু বা সহিংস ঘটনা মুহূর্তেই প্রতীকে পরিণত হয়। সেই প্রতীককে ঘিরে আবেগ তৈরি হয়, এবং আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা হয়। সত্য সেখানে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ইতালীয় দার্শনিক উমবের্তো একো Inventing the Enemy গ্রন্থে লিখেছিলেন, “When societies lose facts, they invent enemies.” বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। ভিন্ন মত মানেই শত্রু, ভিন্ন প্রশ্ন মানেই ষড়যন্ত্র।
এই বিভ্রান্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো-এটি সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট The Origins of Totalitarianism-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে মিথ্যা ও পুনরাবৃত্ত প্রচারণা মানুষকে এমন এক মানসিক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে তারা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করাই বন্ধ করে দেয়। তখন সহিংসতা আর অপরাধ থাকে না; হয়ে ওঠে ‘ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ’।
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম এই সংকটে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে। একদিকে রাষ্ট্রীয় চাপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হুমকি, আর তৃতীয়দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রায়াল। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের World Press Freedom Index অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের জন্য বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যখন সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা হয় বা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তখন আসলে জনগণের সত্য জানার অধিকারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দার্শনিক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা Political Order and Political Decay-এ বলেছেন, রাষ্ট্রের বৈধতা নির্ভর করে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহের ওপর। কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই বয়ানের অংশ হয়ে যায়, তখন সেই বৈধতা দুর্বল হয়। বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে আমরা দেখছি-স্বচ্ছ তদন্তের বদলে নীরবতা, কিংবা একতরফা বক্তব্য।
রেহমান সোবহানের বক্তব্য এই জায়গায় এসে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। তিনি Untranquil Recollections গ্রন্থে লিখেছেন, “বাংলাদেশের সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক ও ঐতিহাসিক সংকট।” তরুণ প্রজন্ম আজ জানতে চায়-কেন বারবার গণতন্ত্র ব্যাহত হয়েছে, কেন সহিংসতা রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, কেন ক্ষমতার পালাবদল মানেই ইতিহাসের নতুন সংস্করণ। এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রবিরোধী নয়; এগুলো নাগরিক সচেতনতার প্রকাশ।
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে শূন্যস্থান পূরণ করে গুজব ও চরমপন্থা। একাংশ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আরেকাংশ আবেগে উগ্র পথে হাঁটে। দুটোই রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম On History গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন-“A society that loses its historical compass becomes vulnerable to manipulation.”
বাংলাদেশ আজ সেই ঝুঁকির মুখে। ইতিহাস যদি দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়, সত্য যদি রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাব একটি বিভ্রান্ত রাষ্ট্র। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিহাসকে বহুমাত্রিক করতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন করতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-ভুল তথ্যের রাজনীতিকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করতে হবে।
সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা কঠিন, কিন্তু মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাষ্ট্র টেকে না। ইতিহাস বিকৃত করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। আজ যে ভুল তথ্যকে হাতিয়ার বানানো হচ্ছে, কাল সেটিই ফিরে এসে আমাদের গণতন্ত্র, সামাজিক বন্ধন ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে ক্ষতবিক্ষত করবে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম সত্য জানতে চায়। এটি তাদের অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইতিহাস একদিন আমাদের জিজ্ঞাসা করবে-আমরা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম, না মিথ্যার সুবিধা নিয়েছিলাম?
এম এ হামিদ
সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী
সাধারণ সম্পাদক: সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার (সিবিটি)
ই-মেইল: theatrecbt@gmail.com
No comments yet. Be the first to comment!