মতামত

ফ্যাসিস্টদের পতন-এখন গণতন্ত্র ফেরানোর সময়

আপডেট: জানু ১৮, ২০২৬ : ০৩:৩২ পিএম ১৬৬
ফ্যাসিস্টদের পতন-এখন গণতন্ত্র ফেরানোর সময়

এম এ হামিদ

বাংলাদেশের রাজনীতি এক অভূতপূর্ব টার্নিং পয়েন্ট অতিক্রম করছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র যেন এক ফ্যাসিবাদী বন্ধনীর ভেতরে বন্দী ছিল—যেখানে ক্ষমতাই সত্য, শাসনই আইন, আর জনগণ ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের শত্রু। এই দমনমূলক শাসনব্যবস্থা কেবল রাজনৈতিক দলকে নয়, দেশের সাধারণ মানুষকেও নিরাপত্তাহীনতা, ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবদমনবোধের মধ্যে রেখেছিল। সাম্প্রতিক বিচার ও রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রমাণ করেছে—যে শক্তি নিজেকে অনিবার্য মনে করে, ইতিহাস তাকে অনিবার্য পতনের মধ্যেই ফেলে দেয়। আজ রাষ্ট্র সেই ভস্ম থেকে বেরিয়ে নতুন পথের সন্ধান করছে—যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন একটি মিলিত জাতীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ কিভাবে কাজ করে—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই স্মরণ করতে হয় উমবের্তো ইকোর বিখ্যাত প্রবন্ধ Ur-Fascism। তিনি দেখিয়েছেন, ফ্যাসিবাদ সর্বপ্রথম একটি শত্রু তৈরি করে, তারপর সেই শত্রুকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং শেষ ধাপে তাকে দমনে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে বৈধতা দেয়। বাংলাদেশে গত এক দশকের ঘটনা—বিরোধী দলকে ‘ষড়যন্ত্রকারী’, শিক্ষাবিদকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, সাংবাদিককে ‘বিদেশি এজেন্ট’, কিংবা ভিন্নমতকে ‘উগ্রপন্থী’—ঘোষণার মাধ্যমে ঠিক এই কৌশলই প্রয়োগ করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্ট্যানফোর্ড ফ্যাসিজম স্টাডিজ সেন্টার (২০২০) যে চারটি সূচক দিয়েছে—দলীয় নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দমন, বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিতকরণ এবং ভয় সৃষ্টি করে ক্ষমতা ধরে রাখা—সেগুলোর প্রতিটি ছাপই গত শাসনের সময়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল।
ফ্যাসিবাদী শাসনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—রাষ্ট্র নিজেই একটি মব-শক্তিতে পরিণত হয়। গত কয়েক বছরে যথা-তথায় বিক্ষোভ, দলীয় ক্যাডারদের উচ্ছৃঙ্খলতা, পুলিশি অভিযান, আদালত চত্বরে সহিংসতা এবং মানুষকে হঠাৎ ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা—সবই ছিল রাজনীতিকে অরাজনীতিকরণের অংশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (২০২২) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন বলেছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাবেশ, মতপ্রকাশ ও সংগঠিত বিরোধিতা ছিল “systemically restricted through intimidation and coercion.” একইভাবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ তোলে—গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে নজরদারি ও মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে নিস্তব্ধ করে রাখা হয়েছিল। অস্থিরতা সৃষ্টি করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল ইতিহাসে নতুন নয়; নাওমি ক্লেইন তার Shock Doctrine–এ উল্লেখ করেছেন, সংকট সৃষ্টি করাই অনেক স্বৈরশাসনের অস্ত্র।
রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার উদাহরণ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে মধ্যরাতে উচ্ছেদ করা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়। বিবিসি, আল জাজিরা, ডয়চে ভেলে—সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমই এ ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছে। একইভাবে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ড ঘোষণা—যা নিয়ে ১০০-র বেশি নোবেল বিজয়ীসহ আন্তর্জাতিক সমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছিল—প্রমাণ করে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যক্তিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে আদালত ব্যবহারে পিছপা হয়নি। আজ সেই ফ্যাসিস্ট রাজনীতির রূপকাররা আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত—এ রায় কেবল আইনের নয়, বরং জনতার দীর্ঘদিনের অপমান, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার প্রতিকার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক বর্বরতার ধারাবাহিকতা দেখা গেছে, তা যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক উদাহরণ হয়ে থাকবে। তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী থেকে শুরু করে বিএনপি–র শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে টার্গেট করে যে মিথ্যা মামলা, কারাবন্দি, নির্বাসন ও অপমানের রাজনীতি চালানো হয়েছে—তা ছিল প্রতিহিংসার সবচেয়ে নগ্ন রূপ। শুধু নেতৃত্বই নয়, নিম্নস্তরের অসংখ্য কর্মীকে রাতের অন্ধকারে তুলে নেওয়া, গুম করা, রিমান্ডে নির্যাতন করা, ‘ক্রসফায়ারের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানো—এসব ছিল একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের নিত্য দিনলিপি। একই সঙ্গে জামায়াত ইসলামী ও ইসলামি ছাত্রশিবিরের প্রচুর নেতাকর্মী, দেশব্যাপী আলেম-ওলামাদের ওপরও অব্যাহত নিপীড়ন ও হয়রানি চলে; কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শই নিরাপদ ছিল না রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধের হাত থেকে। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে নৃশংস ও অমানবিক প্রশাসনিক হামলা—যেখানে গভীর রাতে হাজারো নিরীহ মানুষ, আলেম-ওলামা ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর পানি কামান, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সশস্ত্র অভিযান চালানো হয়েছিল—তা এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এই চক্র থেমে থাকেনি; বরং আরও ভয়ংকর রূপ নেয় ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে। নুরুল হক নূর—একজন তরুণ ছাত্রনেতা—কে বারবার হামলা, মিথ্যা মামলা, অপহরণের হুমকি ও চরম উৎপীড়নের মুখে দাঁড়াতে হয়; তার ওপর রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সহিংসতার যে তীব্রতা চালানো হয়েছে তা একটি স্বৈরাচারী সরকারের আক্রোশকামী চরিত্রকেই প্রমাণ করে। একই সঙ্গে নাহিদ, সারজিস, হাসনাতসহ ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় যেসব তরুণেরা গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে রাস্তায় নেমেছিল, তাদের ওপরও চালানো হয় অসহনীয় নির্যাতন, টার্গেটেড হামলা, রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং কখনো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ফেলে রাখা। এসব ঘটনা প্রমাণ করে—অতীতের সেই দমন-পীড়ন কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক অধ্যায় নয়; বরং একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, যার উদ্দেশ্য ছিল—যেকোনো বিরোধী কণ্ঠ দমন, গণতন্ত্রকে স্তব্ধ করা এবং একটি ফ্যাসিবাদী ক্ষমতাকাঠামোকে চিরস্থায়ী করা।
ইতিহাস বলে—যে শাসন জনগণকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, তার পতন অনিবার্য। মুসোলিনি, সালাজার, পিনোশে কিংবা সমসাময়িক স্বৈরশাসন—সবই মানুষের উঠে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে পতিত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই একই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। ফ্রিডম হাউস (২০২৩) সতর্ক করেছিল—বাংলাদেশ দ্রুত “not free”-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জনগণের বিস্ফোরণ, আন্তর্জাতিক চাপ, প্রশাসনের অভ্যন্তরে অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক বৈধতার সংকট মিলিয়ে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব শুরু হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়—বিচারপ্রক্রিয়া। গণঅপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম–নিখোঁজ, বিচারবহির্ভূত হত্যা—এসবের বিচার কেবল রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ। ইতিহাসে নুরেমবার্গ ট্রায়াল, চিলি ও আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসকদের বিচার, কিংবা রোয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালের মতো উদাহরণ দেখায়—গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর ভিত্তি দাঁড়ায় ন্যায়বিচারের ওপর। বাংলাদেশ সেই ধারায় এগোচ্ছে—এটাই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক বার্তা।
তবে বিচারই সব নয়। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য এখন প্রয়োজন চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রথমত, প্রশাসনের depoliticization। দীর্ঘদিন ধরে আমলাতন্ত্র একটি দলীয় কাঠামোর অঙ্গ হয়ে উঠেছিল; ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গভার্নেন্স ইন্ডিকেটর (২০২১) এটিকে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে আদালত মুক্ত না হলে গণতন্ত্র টিকবে না। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা। RSF ও CPJ বারবার বলেছে—বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ছিল রাষ্ট্রের চাপে বন্দী। চতুর্থত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
এখানেই আসে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ইভেন্ট নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র বৈধ পথ। ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া, ইউএনডিপি, কমনওয়েলথ ইলেকশন স্ট্যান্ডার্ডস—সব প্রতিষ্ঠানের অভিমত এক: একটি অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো নিরপেক্ষ নির্বাচন না দিলে রাষ্ট্রের গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে। বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব-জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং একটি অংশগ্রহণমূলক, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে যেখানে অতীতের দহন নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ খুলে দিয়েছে। আমরা দেখেছি—গণতন্ত্র কতটা ভঙ্গুর, আবার জনগণের শক্তি কতটা অপ্রতিরোধ্য। ফ্যাসিবাদের অন্ধকার আমাদের পোড়ালেও—এই আগুনই রাষ্ট্রকে নতুন আলো দেখিয়েছে। এখন প্রয়োজন ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, মানবিক রাষ্ট্রদৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সম্মিলিত প্রয়াস। রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের। আর জনগণই চূড়ান্ত বিচারক। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই এখন একটি স্বচ্ছ বার্তার ওপর দাঁড়িয়ে-ফ্যাসিবাদের দহন শেষ হয়েছে; এখন শুরু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের যুগ।


এম এ হামিদ
সাংস্কৃতি ও মানবাধিকার কর্মী
সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!