মতামত

চেহারা লুকানো ভোট: সংবেদনশীলতা বনাম অপব্যবহার

আপডেট: ফেব ১১, ২০২৬ : ০৪:৫০ পিএম ১৩
চেহারা লুকানো ভোট: সংবেদনশীলতা বনাম অপব্যবহার

এম এ হামিদ

সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী সমন্বয়কারী: নবান্ন ফাউন্ডেশন গণতন্ত্র কোনো স্লোগান নয়, কোনো উৎসবও নয়। এটি ব্যানার, পোস্টার কিংবা মঞ্চভিত্তিক উচ্ছ্বাসের বিষয় নয়; গণতন্ত্র একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বৈধতার সম্পর্ক স্থাপন করে। এই প্রক্রিয়া নিয়মিত, নিরবচ্ছিন্ন এবং যাচাইযোগ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, গণতন্ত্র হলো “procedural legitimacy”—অর্থাৎ ক্ষমতার বৈধতা আসে পদ্ধতির ভেতর দিয়ে, ফলাফলের মাধ্যমে নয়। সেই প্রক্রিয়ার একমাত্র বৈধ প্রবেশদ্বার হলো ভোটকেন্দ্র। ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে একজন নাগরিক যখন নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং নিজের মত প্রকাশ করেন, তখনই রাষ্ট্র বৈধতা অর্জন করে। এটি কোনো প্রতীকী কাজ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক চুক্তি, যেখানে নাগরিক সম্মতি রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই বৈধতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ হয় কেবল একটি সরকার নয়—পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংবিধান এবং নাগরিক–রাষ্ট্র সম্পর্ক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় অস্বীকার করাই ছিল রাষ্ট্রভাঙনের সূচনাবিন্দু। আবার আফ্রিকার একাধিক দেশে—জিম্বাবুয়ে বা কঙ্গোতে—ভোট প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিনের জন্য ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও গভীর, কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং সংবিধান—সবকিছুই জনগণের সম্মতির ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ভোটাধিকার এখন রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্ন
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভোটাধিকার আর কেবল একটি নাগরিক অধিকারের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। চেহারা লুকানো ভোট, ভুয়া ব্যালট, একাধিক কেন্দ্রে একই ব্যক্তির ভোট, প্রক্সি ভোট—এসব আর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এগুলো একটি কাঠামোগত সংকেত হিসেবে উঠে আসছে। ২০১৪ ও ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল একটি ফ্যাসিবাদি পন্থা, যার উপাধিও দেয়া হয়-বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত, দিনের ভোট রাতে এবং আমি আর ড্যামি ভোট।  সেই সময়ের বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো যে প্রধান প্রশ্নটি তুলেছিল, তা ছিল ভোটার উপস্থিতি ও ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে। 
এই সংকেতগুলো উপেক্ষা করা মানে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। কারণ, ভোট যদি অর্থবহ না হয়, তাহলে সরকার বৈধতা হারায়; আর বৈধতা হারানো সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে কেবল প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে টিকিয়ে রাখে। ল্যাটিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা বলে, এই ধরনের রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত হয় সামরিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়, নয়তো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়ে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। এখনও যদি সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং ভয় মুক্ত ও অবাধ নিরপেক্ষতা না হয় তাহলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হেরে যাবে।
সংবিধান কী বলে রাষ্ট্রীয় বৈধতা সম্পর্কে
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক সত্য হলো—ক্ষমতা তখনই বৈধ, যখন তা জনগণের সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই সম্মতির একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো নির্বাচন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।” ১২২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের ভোটাধিকারকে স্বতন্ত্র, ব্যক্তিগত ও অবিভাজ্য অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। এখানে ভোটাধিকারকে কোনো শর্তসাপেক্ষ সুবিধা হিসেবে নয়, বরং নাগরিকত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই সাংবিধানিক কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। Universal Declaration of Human Rights-এর ২১(৩) অনুচ্ছেদ এবং ICCPR-এর ২৫ অনুচ্ছেদ উভয়ই জনগণের ইচ্ছাকে সরকারের কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন—উভয়ই এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়: ভোটের স্বচ্ছতা ছাড়া রাষ্ট্রের বৈধতা অসম্ভব।
চেহারা লুকানো ভোট: সংবেদনশীলতা বনাম অপব্যবহার
বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল সমাজ। নারী ভোটারদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন এখানে বাস্তব। মুখ ঢাকা অবস্থায় ভোট দেওয়ার বিষয়টি নতুন নয় এবং এটিকে এককভাবে অমানবিক বলা যায় না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই সংবেদনশীলতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। Representation of the People Order (RPO), 1972-এর ২০ ধারা স্পষ্টভাবে বলে, ভোট গ্রহণের পূর্বশর্ত হলো ভোটারের সনাক্তকরণ। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রয়োজনে নারী ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করতে নারী কর্মকর্তার ব্যবস্থা রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অর্থাৎ আইন কখনোই নারী নিরাপত্তা বনাম ভোটের স্বচ্ছতা—এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেনি। দ্বন্দ্বটি তৈরি করা হয় প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সুবিধার জন্য। ভারতের নির্বাচন কমিশন, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থায় নারী ভোটারদের জন্য আলাদা বুথ ও নারী কর্মকর্তা রাখা হয়—এতে পরিচয় যাচাইও হয়, নিরাপত্তাও বজায় থাকে। বাংলাদেশেও এই মডেল প্রয়োগ সম্ভব, যদি সদিচ্ছা থাকে।
ভুয়া ভোট কেন রাষ্ট্রীয় অপরাধ
ভোটে জালিয়াতিকে অনেক সময় ‘অনিয়ম’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এটি বাস্তবে রাষ্ট্রীয় বৈধতার ওপর সরাসরি আঘাত। ভুয়া ভোট মানে প্রকৃত নাগরিক সম্মতির জায়গায় কৃত্রিম সম্মতি তৈরি করা। এটি শুধু RPO লঙ্ঘন নয়; এটি সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের মৌলিক চেতনার বিরোধী, যেখানে বলা হয়েছে—“সমস্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ।”
আন্তর্জাতিকভাবে ভুয়া ভোটকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত একাধিক রায়ে বলেছে, ভোট জালিয়াতি “systemic violation of democratic order”। আফ্রিকান ইউনিয়ন চার্টারেও বলা হয়েছে, অবাধ নির্বাচন ছাড়া রাষ্ট্র সদস্যপদ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে উন্নয়ন সহযোগিতা, কূটনৈতিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের ওপর।
শহরকেন্দ্রিক সফট ম্যানিপুলেশন
ভোট জালিয়াতি সবসময় লাঠি বা বন্দুক দিয়ে হয় না। শহরাঞ্চলে ক্রমেই বাড়ছে তথাকথিত “সফট ম্যানিপুলেশন”—যেখানে সহিংসতা নেই, কিন্তু নিয়মের ফাঁক গলে ফলাফল প্রভাবিত করা হয়। পরিচয় যাচাইয়ে শিথিলতা, অতিরিক্ত সহযোগিতার নামে প্রক্সি ভোট, একাধিক কেন্দ্রে একই ব্যক্তির উপস্থিতি—এসবই এই প্রক্রিয়ার অংশ।
গ্রামীণ সমাজে সামাজিক নজরদারি প্রবল হওয়ায় এই ধরনের অনিয়ম তুলনামূলক কম। কিন্তু শহরে ভোটাররা বিচ্ছিন্ন, ফলে সংগঠিত গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরি হয়। কেনিয়ার ২০১৭ সালের নির্বাচন বাতিলের অন্যতম কারণ ছিল শহরাঞ্চলে এই ধরনের সফট ম্যানিপুলেশন। বাংলাদেশ এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
ব্যালট পেপারের হিসাব: সংখ্যাই শেষ সত্য
ভোট জালিয়াতির সবচেয়ে বড় শত্রু আবেগ নয়, স্লোগান নয়—হিসাব। ব্যালট পেপারের মোট সংখ্যা, ব্যবহৃত, বাতিল ও অব্যবহৃত ব্যালটের অঙ্ক—এই হিসাবই ভোটের স্বচ্ছতার মেরুদণ্ড। নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, এই হিসাবের সামান্য অসঙ্গতিও লিখিতভাবে নথিভুক্ত করার কথা।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো—যেমন EU Election Observation Mission—সবচেয়ে আগে এই হিসাবই যাচাই করে। কারণ সংখ্যাই মিথ্যার জায়গা কম রাখে। যেখানে অঙ্ক মিলবে না, সেখানেই প্রশ্ন উঠবে। আর প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রবিরোধী নয়; বরং প্রশ্নহীন নীরবতাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।
পোলিং এজেন্ট ও ব্যালট বাক্সের নীরব শক্তি
পোলিং এজেন্ট কোনো প্রতীকী পদ নয়। তিনি ভোটকেন্দ্রে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তার দায়িত্ব সংঘাত নয়, নথি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন পোলিং এজেন্ট হলো “first line of electoral accountability” । অসুস্থ, অতিবয়স্ক বা নিয়ম না বোঝা কাউকে এই দায়িত্বে রাখা মানে পুরো কেন্দ্রকে ঝুঁকিতে ফেলা।
একইভাবে ব্যালট বাক্স কোনো সাধারণ কন্টেইনার নয়। এটি নাগরিক ইচ্ছার আধার। বাক্সের সিল, অবস্থান ও দৃশ্যমানতা—এসবই নিয়মের অংশ। বাক্স সরানো বা আড়াল করা আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত।
অহিংস দায়িত্বশীল নাগরিকত্বই শেষ আশ্রয়
ভোটকেন্দ্রে সন্দেহ মানেই সংঘর্ষ নয়। আইনসম্মত রাষ্ট্রে সমাধান হয় নথি ও লিখিত আপত্তির মাধ্যমে। ইতিহাস প্রমাণ করে—সহিংসতা গণতন্ত্র রক্ষা করে না। গণতন্ত্র রক্ষা করে নিয়ম, নথি ও নাগরিক শৃঙ্খলা।
ভোটাধিকার হারলে কোনো দলই জেতে না। হারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মানে শুধু রাজনৈতিক মতবাদ নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। এই লড়াইয়ে দায়িত্বশীল নাগরিকত্বই শেষ আশ্রয়। আর এই লড়াইয়ে জয় মানেই—বাংলাদেশের জয়।

 

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!