রায়হান আহমেদ তপাদার
বর্তমান যুগে সমাজের রূপান্তর একটি অনিবার্য বাস্তবতা। বিশেষ করে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন আমাদের সামাজিক সম্পর্ক, যোগাযোগের ধরন, জীবনের রীতি-নীতি এমনকি মূল্যবোধেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। সমাজ কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়, এটি মানুষ দ্বারা নির্মিত এবং মানুষই এর কেন্দ্রে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে সে নিরাপত্তা, ভালোবাসা, মর্যাদা ও সহানুভূতির সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে। সমাজ মানুষকে তার শেকড় চিনতে শেখায়,সংস্কৃতি ধারণ করতে শেখায় এবং একটি নৈতিক কাঠামোর মধ্যে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তখনই কার্যকর হয়, যখন প্রতিটি মানুষ তার দায়িত্ব পালন করে। একজন মানুষের আচরণ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ শুধু তার নিজের ওপর নয়, সমগ্র সমাজে প্রভাব ফেলে। আমরা যখন রাস্তায় আবর্জনা ফেলি, তা শুধু পরিবেশ নয়, সমাজের নাগরিকচেতনার প্রতিফলনও ব্যর্থ করে তোলে। সমাজ যতটা না বড় কোনো রাষ্ট্র কাঠামো, তার চেয়েও বেশি একটি মানসিক ও মানবিক বন্ধনের জায়গা। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ গঠনে প্রত্যেকটি মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।আজকের সমাজে সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আমরা একদিকে প্রযুক্তির উৎকর্ষে গর্বিত, কিন্তু অন্যদিকে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি, সহনশীলতা ও শ্রদ্ধার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কমে গেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পাই। শিশু নির্যাতন, নারী নিপীড়ন, প্রবীণ অবহেলা কিংবা প্রতিবেশীকে অমানবিক আচরণ-এসব এখন যেন সাধারণ খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ কিংবা সামাজিক রীতিনীতিও আজ আর মানুষের মানবিকতা জাগাতে যথেষ্ট নয়।
যদিও আমাদের মৌলিক সামাজিক সমস্যাগুলোতে এক ধরনের রূপান্তর তৈরি হয়েছে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অধিক জনসংখ্যা এবং পুষ্টি সমস্যা সময়ের ব্যবধানে আমরা অনেকটা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। এখন আমরা এগুলোকে মূল সমস্যা মনে করলেও সমস্যাগুলোর সঙ্গে আমাদের সমাযোজন অনেক বেশি। সরকারি উদ্যোগে অসহায় ও দরিদ্র মানুষ কোনো না কোনোভাবে দুমুঠো খেয়ে বসবাস করছে। কিন্তু এর বাইরে আমরা এমন সব সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছি, যা প্রতিনিয়ত আমাদের কষ্ট দিচ্ছে। আমাদের অন্যান্য সমস্যাকে মোকাবেলা করতে বাধার সৃষ্টি করছে এবং সার্বিকভাবে আমাদের উন্নতির জন্য এক বড় অন্তরায় তৈরি করছে। দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও মাদকের মতো সামাজিক সমস্যা আজ আমাদের এমনভাবে গ্রাস করছে, যা থেকে আমরা কোনোভাবেই মুক্ত নই। এই সমস্যাগুলো আমাদের সমাজে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে, যা নিরসনে সত্যিকার, সমন্বিত এবং গঠনমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। সমাজে এই সমস্যাগুলো বিস্তারের জন্য আমরাই কমবেশি দায়ী। অন্যান্য সমস্যা; যেমন: দারিদ্র্য কিংবা বেকারত্বের মোকাবেলায় এককভাবে সরকারের উদ্যোগ অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু মাদক কিংবা সন্ত্রাসের মতো সমস্যা একান্ত ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ছাড়া কোনোভাবেই নিরসন সম্ভব নয়। দুর্নীতিকে আমরা একটি বড় সমস্যা বলতে পারি। সমাজের সর্বত্র দুর্নীতির ছোঁয়া লেগেছে। আমরা দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি, সভা-সেমিনারের আয়োজন করি এবং দুর্নীতির ভয়াবহতা সমাজের সামনে তুলে ধরি। কিন্তু দুর্নীতি মোকাবেলার মানদণ্ডে আমরা কোনোভাবেই সন্তোষজনক অবস্থানে যেতে পারছি না। আমাদের রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবক, পেশাজীবী, শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দুর্নীতি নিয়ে কথা বলে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তারা দুর্নীতির বিষয়ে জনগণের সামনে তুলে ধরা থেকে শুরু করে সব কাজই করছে। কিন্ত কেন জানি কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি সবাই দুর্নীতির বিষয়ে কড়া জবাব দিচ্ছেন। অন্যরাও তা-ই করছেন। কিন্তু কেন দুর্নীতি কমছে না? সবাই কি মুখে মুখে বলছেন, নাকি সত্যিকারে বলছেন, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে। এমনও হয়, আমরা বলছি, কিন্তু মনে-প্রাণে চাই না দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, নাকি মুখে বলেও আমরা নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছি? পৃথিবীতে কোনো সমস্যাই সম্পূর্ণভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, কিন্তু সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য আমাদের চেষ্টার কি কোনো ঘাটতি আছে? মাদক আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। সমাজের ওপর মাদকের প্রভাব এতই ভয়াবহ যে আমরা প্রতিনিয়ত এ সমস্যা মোকাবেলা করছি। আমাদের যুবসমাজের একটি বড় অংশ আজ মাদকে আক্রান্ত। তারা জীবনীশক্তি অচিরেই ধ্বংস করছে এবং এক নেতিবাচক প্রভাব সমাজের কাছে রেখে যাচ্ছে। মাদকের মতো আমাদের আরেক আতঙ্কের নাম সন্ত্রাস। সন্ত্রাসী কার্যক্রম আমাদের জীবনহানি ঘটাচ্ছে। পথে-ঘাটে আমরা প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শিকার হচ্ছি। অন্যান্য সমস্যার মতো এখানেও আমাদের রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, পেশাজীবীসহ অন্যরা সবাই সরব। মিটিং ও সভা-সমাবেশে বক্তব্যে এমনভাবে কথা বলি, যেন কালকেই মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ তৈরি হবে। কিন্তু এখানেও কোনো প্রতিকার নেই। বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা শুধু মুখেই বলি, কিন্তু সমস্যা নিরসনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ কতজনই বা নিই।
যদিও বা কেউ কেউ পদক্ষেপ নিচ্ছেন, কিন্তু তা কার্যকর হচ্ছে না। আমাদের দরকার কার্যকর পদক্ষেপ, যেখানে সবাই মন থেকে কথা বলবে এবং সমস্যা নিরসনে মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে। এ কাজে যে ধরনের বাধা আসবে, তা মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেবে। আমাদের দরকার একটি সমন্বিত পদক্ষেপ এবং সত্যিকার সামাজিক আন্দোলন। আমাদের ওয়াদা করতে হবে, কোনোভাবেই আমরা দুর্নীতি, মাদক কিংবা সন্ত্রাসের মতো কাজকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব না। আমরা শুধু মুখে বলব না, কাজ করেও দেখাতে চাই। আমাদের কোনো অর্জনই সফল হবে না,যদি না আমরা উপরোক্ত সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে না পারি। তাই আসুন, আমরা শুধু সভা-সেমিনারে দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের মতো সমস্যা নিয়ে কথা না বলে বাস্তবে এই সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। নিজে মন থেকে প্রতিজ্ঞা করি এবং অন্যকে উৎসাহিত করি। কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার জন্য কোনো সহায়তা নয়। প্রয়োজনে আইনের সহায়তা নিই এবং আইনের হাতে অপরাধীদের তুলে দিই। সমাজের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট একটি সামাজিক আন্দোলনই পারবে এই সমস্যাগুলো সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে।সমাজের উন্নয়ন কেবল রাষ্ট্র বা সরকারের কাজ নয়, প্রতিটি নাগরিকের নিজের দায়িত্ব ও ভূমিকাও এখানে অপরিহার্য। নাগরিক দায়িত্ব মানে সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা, যা প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত। একজন মানুষ যখন রাস্তা পরিষ্কার রাখে, বয়স্কদের সম্মান করে, বাচ্চাদের সুশিক্ষা দেয় কিংবা প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ায়, তখন সে শুধু একজন ভালো মানুষ নয়, একজন সচেতন নাগরিকও। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে এই সচেতনতা এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। অনেকেই ভাবেন, সমাজের উন্নয়ন সরকারের কাজ অথচ সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায়।
নাগরিকরা যদি তাদের কর্তব্য ভুলে যান, তাহলে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে সমাজ এগোতে পারে না।
সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে দরকার শিক্ষার বিস্তার, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা এবং পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষার চর্চা। কারণ নাগরিক যদি সচেতন না হয়, তাহলে কোনো সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য হতে পারে না।
সমাজ একটি জীবন্ত সত্তা, যার প্রতিটি কোষ হলো তার নাগরিকরা। এই সমাজের কাঠামো, মনস্তত্ত্ব, অর্থনীতি এবং নৈতিক ভিত্তি- সবই নির্ভর করে মানুষের আচরণ ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর। আজকের বিশ্বায়নের যুগে সমাজের রূপ প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন চ্যালেঞ্জ, আবার খুলে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ারও। বৈষম্য, অবচেতন নাগরিকত্ব, মূল্যবোধের ক্ষয় এবং সংস্কৃতির ভাঙনে সমাজ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের উপায় লুকিয়ে আছে আমাদের চেতনায়, চিন্তায় এবং কর্মে। আমরা যদি চাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায্য ও নৈতিক সমাজ গড়ে তুলতে, তাহলে প্রয়োজন সামাজিক দায়বদ্ধতা, আত্মবিশ্বাস এবং সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ ভালোবাসা। এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, সমাজ মানে প্রতিদিনের জীবনচর্চায় আমাদের আচরণই সমাজকে গঠন করে। তাই নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত, শুধু নিজেদের উন্নতির কথা না ভেবে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে ভাবা, কাজ করা এবং তরুণ প্রজন্মকে একটি মানবিক ও মূল্যনির্ভর সমাজের চিত্র দেখানো। সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন তার প্রতিটি মানুষ সজাগ থাকে, সচেতন থাকে এবং নিজের ভূমিকাকে সম্মান করে। এই চেতনা জাগ্রত হলে তবেই আমরা একটি সভ্য, মানবিক এবং সমন্বিত সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!