জাতীয় মোবাইল নেটওয়ার্কে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, বাজারে প্রভাব এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত উঠে আসছে।
মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক মোবাইল ফোন ব্র্যান্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর একটি অডিও ক্লিপ প্রকাশ করেন। সেখানে দাবি করা হয়, NEIR বাস্তবায়নের বিরোধিতায় কিছু ব্যবসায়ী বহিরাগত লোকজনকে আন্দোলনে অংশ নিতে আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অডিওটি বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি পক্ষকে দায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
করহার ও আমদানি নীতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বর্তমানে মোবাইল ফোন আমদানিতে প্রায় ৪৪ শতাংশ কর আরোপ এবং সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে। এর ফলে মোবাইল ফোনের দাম বাড়ছে এবং বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সারা দেশে হাজারো ছোট ও মাঝারি মোবাইল ফোনের দোকান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, করহার ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং সব ব্যবসায়ীর জন্য সমান আমদানির সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
তথ্য গোপনীয়তা ও ডাটা সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
NEIR ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের তথ্য সংরক্ষণ এবং সম্ভাব্য ট্র্যাকিং নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তথ্য গোপনীয়তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
বিশেষ করে ডাটা কোথায় সংরক্ষণ করা হবে এবং তা দেশীয় নাকি বিদেশি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল—এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশি ডাটা স্টোরেজ ব্যবহৃত হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রবাসীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির শঙ্কা
প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে NEIR ব্যবস্থা বাড়তি ভোগান্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আনা মোবাইল ফোন নিবন্ধনের প্রক্রিয়া জটিল এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ায় স্বল্প ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা সমস্যায় পড়তে পারেন।
নিবন্ধন জটিলতার কারণে ফোন ব্লক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলে তা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাবে বলে মত দিয়েছেন তারা। প্রবাসীদের জন্য সহজ ও স্বল্প সময়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর দাবি উঠেছে।
বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে স্বচ্ছতার তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, NEIR ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এর বাস্তবায়নের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। তারা বলছেন, এই ধরনের বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ী, ভোক্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও প্রবাসী প্রতিনিধিসহ সব অংশীজনের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা জরুরি ছিল।
তাঁদের মতে, সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানো গেলে NEIR ব্যবস্থা ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মোবাইল ফোন বাজারে স্থিতিশীলতাও বজায় রাখতে পারবে।
No comments yet. Be the first to comment!