প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশবাসী সম্মিলিতভাবে দেশের ওপর নিজেদের পরিপূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি। এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত তরুণেরা উৎসবমুখর করে রাখবে। কারণ তাদের মনে কোনো ভয়ডর নেই।
আজ মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) রাতে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা।ড. ইউনূস বলেন, ‘আমাদের কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মনে কোনো ভয় নেই। তাই তারা নির্বাচনের আগের এই দুই মাসের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তকে উৎসবমুখর করে রাখবে। তারা দেশকে সব ধরনের হিংসা ও কোন্দল থেকে রক্ষা করবে।’
তিনি তরুণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘আমাদের তরুণদের রক্ষা করুন। তাহলেই আমরা সবাই এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা পাবে।’ তিনি বলেন, যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তারা বুঝে গেছে—এই অস্ত্রহীন, ভীতিহীন তরুণরাই তাদের পুনরুত্থানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনের আগেই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে নিজেদের রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে একটি চক্র। এ জন্য তারা নানা রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। চোরাগোপ্তা হত্যাচেষ্টাও তার একটি রূপ। আরও কঠিন পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ড. ইউনূস বলেন, দেশের সবাইকে জোর গলায় বলতে হবে—আমরা তরুণদের রক্ষা করব। পুরোনো আমলের দাসত্বের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের ওপর জনগণের পূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভাষণে দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে—জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন।
তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে একটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ওই রায়ে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সরকার তাঁকে ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে দেশে ফেরাতে ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেছে। বহু পুরোনো আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সংস্কারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ জারি করা হয়েছে, যা মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের পথ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য এখন জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন। সে কারণেই আসন্ন নির্বাচনে একই সঙ্গে এ সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা হ্যাঁ বা না ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে মত জানাবেন। ড. ইউনূস জানান, নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনকে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
পুলিশ ও মানবাধিকার বিষয়ে সংস্কারের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। সে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে। একইভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।
ভাষণের শেষাংশে ড. ইউনূস বলেন, দেশ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ জনগণের হাতেই। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুখী ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন সবার দায়িত্ব। তিনি দেশবাসীকে আবারও মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানান।
আরএস
No comments yet. Be the first to comment!