উর্বর উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধা শুধু ভুট্টা-মরিচের জন্য নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি রসমঞ্জুরী-র জন্যও পরিচিত। প্রায় ৭৯ বছর ধরে স্বাদ ও গুণে অনন্য এই মিষ্টি শুধু গাইবান্ধার মানুষের গর্ব নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিতি পেয়েছে এবং দেশের সীমা পেরিয়ে প্রবাসীদের মধ্যেও সুনাম কুড়িয়েছে। তবে এত দীর্ঘ সময়ের জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও এখনও এটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের তালিকায় স্থান পায়নি।
রসমঞ্জুরীর যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। শহরের সার্কুলার রোড এলাকায় ‘রমেশ সুইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় রমেশ চন্দ্র ঘোষ ভারত থেকে দক্ষ কারিগর এনে প্রথম রসমঞ্জুরী তৈরি শুরু করেন। শুরুতে স্থানীয় মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে এর স্বাদ সবার মন জয় করে নেয়।
বর্তমানে রমেশ ঘোষের মৃত্যুর পর তার স্বজনরা ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। গাইবান্ধা শহরে অন্তত ২৫টি মিষ্টির দোকান প্রতিদিন শত শত কেজি রসমঞ্জুরী তৈরি ও বিক্রি করছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও মিষ্টি তৈরি ও বিক্রি করা হচ্ছে।
রসমঞ্জুরী তৈরির প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও দক্ষতার কাজ। গরুর দুধ ফুটিয়ে ছানা তৈরি করা হয়, ময়দা, চিনি ও সুজি মিশিয়ে আঠালো মণ্ড তৈরি করা হয় এবং সাদা এলাচের গুঁড়া মিশিয়ে গুটি বানানো হয়। পরে এসব গুটি চিনির সিরায় সিদ্ধ করা হয় এবং ঘন ক্ষীরের মধ্যে ডুবিয়ে তৈরি হয় রসে টইটুম্বুর রসমঞ্জুরী।
স্থানীয়রা বলছেন, রসমঞ্জুরী শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি গাইবান্ধার সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। বিয়ে, উৎসব বা অতিথি আপ্যায়নে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রবাসীরা বিশেষ করে শীতকালে বাড়ির জন্য উপহার হিসেবে এই মিষ্টি পাঠান।
গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, “প্রায় আট দশক ধরে দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়ানো রসমঞ্জুরীর জিআই স্বীকৃতি পাওয়াটা যৌক্তিক দাবি।” অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) যাদব চৌধুরি জানান, “রসমঞ্জুরী ইতোমধ্যে জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। জিআই পণ্যের তালিকাভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
রমেশ সুইটসের স্বত্বাধিকারী বাদল চন্দ্র ঘোষ বলেন, “রসমঞ্জুরী দেশের বাইরে পর্যন্ত সুনাম কুড়িয়েছে। এটি দিয়ে এখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।” বর্তমানে প্রতিকেজি রসমঞ্জুরীর দাম ৩৮০ টাকা।
জিআই স্বীকৃতির মাধ্যমে রসমঞ্জুরীকে আরও বড় বাজারে নিয়ে যাওয়ার আশা করছে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সম্প্রদায়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!