নিজস্ব প্রতিবেদক

নগর সরকার গঠনের দাবি: ইশতেহারে স্পষ্ট রূপরেখা চাইলেন নগর বিশেষজ্ঞরা

আপডেট: জানু ১৯, ২০২৬ : ০৪:২৭ পিএম ১৭
নগর সরকার গঠনের দাবি: ইশতেহারে স্পষ্ট রূপরেখা চাইলেন নগর বিশেষজ্ঞরা

ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোর দীর্ঘদিনের দুরবস্থার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সমন্বয়হীনতা ও সিটি করপোরেশনের সীমিত ক্ষমতা—এমন মন্তব্য করেছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের মতে, নগর সরকার (সিটি গভর্নমেন্ট) গঠন করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ না করলে নগরের সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নগর সরকার গঠন এবং নগরের সমস্যাগুলো সমাধানে সুস্পষ্ট রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশোরে ‘ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার’ শীর্ষক এক নগর সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ ও গুলশান সোসাইটির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে সভাপতিত্ব করেন নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার সাদাত ওমর।
সীমিত ক্ষমতায় সিটি করপোরেশন প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা মূলত পরিচ্ছন্নতা ও আলোকসজ্জার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকায় উচ্ছেদ অভিযান টেকসই হয় না।
তিনি জানান, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে প্রতি মাসে ১৯ থেকে ২২ কোটি টাকা জরিমানা আদায় হলেও এর এক টাকাও সিটি করপোরেশন পায় না। পুরো অর্থ চলে যায় কেন্দ্রীয় কোষাগারে। অথচ ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নে সিটি করপোরেশনকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এজাজের মতে, ওয়াসা, রাজউক ও পুলিশকে সিটি করপোরেশনের অধীনে এনে পূর্ণাঙ্গ সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা না করলে নগরের মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। জলবায়ু উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের জন্য নগর নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ।
সমন্বয়ের অভাব জাতীয় সমস্যা
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ঢাকাকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যা নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও দুর্বল করেছে।
তিনি বলেন, ঢাকার ওপর জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ কেবল স্থানীয় নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদী রক্ষা না করলে ঢাকাকে বাঁচানো যাবে না। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া মেয়রের পক্ষে আইনশৃঙ্খলাসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। ঢাকার মেয়রকে শক্তিশালী ও কার্যকর অবস্থানে আনতে হবে।
বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকার উন্নয়নে ১০টি লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি জানান, এগুলো ভবিষ্যৎ ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসেবা, যুব কর্মসংস্থান, কার্যকর রাস্তা ও ফুটপাত, মাদকমুক্ত সমাজ, নিরাপত্তা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবা।
নগর গড়তে নাগরিকদের ভূমিকা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. এস এম খালেদুজ্জামান বলেন, শহর কেবল রাজনীতিবিদরা নয়, নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই গড়ে ওঠে। তিনি ঢাকার পরিবেশ ও নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, তাঁদের ইশতেহারে সমন্বিত নগর সরকার ব্যবস্থা, টেকসই অর্থনীতি, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, নারীর ও সড়ক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
‘কংক্রিট ও গাড়ির শহর’ থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. মুসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, শহরগুলোকে নাগরিকবান্ধব না করে কংক্রিট ও গাড়িনির্ভর নগরে পরিণত করা হয়েছে। গণপরিসর ও খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট কাটাতে কমিউনিটি অংশগ্রহণ জরুরি।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, দেশে প্রায় চার কোটি মানুষ দূষিত এলাকায় বসবাস করছে। সবুজায়ন বাড়ানো ও জলাভূমি রক্ষায় এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর জোর দেন তিনি।
দূষণে কমছে আয়ু মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার সাদাত ওমর বলেন, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার মানুষের গড় আয়ু কমছে সাত বছর সাত মাস। ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পানির নমুনার বড় অংশে ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হয়েছে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন স্থপতি রফিক আজম, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, প্রকৌশলী মো. নুরুল্লাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা।


আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!