বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অবসান হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের।
গৃহবধূ থেকে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রায় ৪১ বছরের। ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির কাউন্সিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সংকটে পড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সে সময় রাজনীতির বাইরে থাকা খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে সক্রিয় হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং একই বছরের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক বক্তব্য দেন তিনি।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে খালেদা জিয়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছরই, ১৯৮৪ সালের ১০ মে, তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৮৩ সালে সাত–দলীয় জোট গঠন করে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নামে। এরশাদের সরকারের সঙ্গে কোনো আপস না করার কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
এই আন্দোলনের সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী করা হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আট বছরে সাতবার অন্তরীণ হয়েও তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে সরে যাননি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তার নেতৃত্বে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে বাংলাদেশ।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর স্বল্প সময়ের জন্য তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। একই বছর অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলে তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠন করেন খালেদা জিয়া। এই জোটের নেতৃত্বে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি।
জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী রেকর্ড
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে কয়টি আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, প্রতিবারই জয়ী হয়েছেন। কোনো সংসদ নির্বাচনে নিজের আসনে পরাজিত না হওয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে তার।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করে। পরে মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় ২০১৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেননি তিনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বয়কট করে বিএনপি। ফলে এক দশকের বেশি সময় তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিলেন।
কারাবরণ ও ব্যক্তিগত বেদনা
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় এক বছর সাব জেলে থাকার সময়ই তার মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যু হয়। প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের মরদেহ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় আবার কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরে করোনা মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। ২০২৫ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন।
জন্ম ও ব্যক্তিজীবন
খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন জলপাইগুঁড়ি (বর্তমান দিনাজপুর) অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দুই ছেলে—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর জননী তিনি।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নির্বাচন ও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা খালেদা জিয়া ছিলেন সময়ের সাক্ষী ও নির্মাতা—দু’টিই। তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন ছিল বিতর্ক ও সংকটে ঘেরা, তেমনি ছিল প্রতিরোধ, সংগ্রাম ও ইতিহাস গড়ার গল্পে ভরপুর।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি হারাল এক প্রভাবশালী ও দীর্ঘদিনের পথনির্দেশক নেত্রীকে।
আরএস
No comments yet. Be the first to comment!