বিশেষ প্রতিবেদন

গণপূর্তের বিল কারসাজির অভিযোগ ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্নের মুখে প্রকৌশলী মাহবুবুর

আপডেট: জানু ০৮, ২০২৬ : ০৫:৪৪ পিএম ২০
গণপূর্তের বিল কারসাজির অভিযোগ ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্নের মুখে প্রকৌশলী মাহবুবুর
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–৩–এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের দায়িত্বে থাকা একটি বড় প্রকল্পের প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিল নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অনুমোদিত বিলের অঙ্কের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি থাকার কথা বলছেন অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো।

এ ঘটনায় ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পে যে অঙ্কের বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার বিপরীতে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নথিতে দেখানো সরঞ্জামের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরঞ্জিত এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিধিবিধান উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অভ্যন্তরীণ নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিল অনুমোদনের সময় অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি, যথাযথ যাচাই ছাড়াই পেমেন্ট প্রসেসিং এবং কিছু ফাইলে তারিখের অসঙ্গতি রয়েছে। এসব বিষয়কে সম্ভাব্য অনিয়মের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীরা বলছেন, ই/এম সার্কেল–৩–এর টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। নির্দিষ্ট কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার নিয়মিত সুবিধা পাচ্ছেন, সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহে পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডারে একটি স্থায়ী গোষ্ঠীর আধিপত্য তৈরি হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে।

ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদ বলেন, “১৭ কোটি টাকার এই বিলটি ওই প্রভাব বলয়ের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে। প্রকৌশলী মাহবুবুর ঘুষ ছাড়া কাউকে কাজ দেন না। প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে অগ্রিম কমিশনের অঘোষিত হার নির্ধারিত থাকে।” তিনি আরও বলেন, প্রকল্পে যে উচ্চ অঙ্কের বিল করা হয়েছে, তার বিপরীতে বাস্তবে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহ হয়নি।

এ বিষয়ে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “স্যারের বিরুদ্ধে লিখলে ঝামেলা হতে পারে। তাঁর হাত অনেক লম্বা।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের বড় অঙ্কের বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নিয়ম মেনে কাজ হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়।”

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রকল্পে ১৭ কোটি টাকার বিল নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নথিপত্রে বৈষম্য বা আর্থিক অস্বচ্ছতার প্রমাণ মিললে তা অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে প্রাথমিক যাচাই শেষে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি।

একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি অডিট ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, “তারিখের অসঙ্গতি, যাচাই ছাড়া পেমেন্ট এবং তড়িঘড়ি অনুমোদন—এসবই উচ্চ ঝুঁকির সংকেত। এটি যদি প্রভাবশালী কোনো নেটওয়ার্কের অংশ হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি সিস্টেমিক দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।”

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তই পারে প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করতে।”

 

আরএস

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!