মঈন মাহমুদ
মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিতামূলক পানি ব্যবস্থাপনার প্রত্যয় নিয়ে আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে দু’দিনব্যাপী ‘১১তম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলন’। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ–এর আয়োজনে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের পাঁচ শতাধিক পানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, নদী আন্দোলনকর্মী ও জলবায়ু অধিকার কর্মী অংশ নিচ্ছেন।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য— “ন্যায়সংগত ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা পুনর্চিন্তা”—বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘ পানি কনভেনশন ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূমিকা
এই সম্মেলনের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়েছে এ কারণে যে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে যোগদান করেছে। সীমান্তবর্তী নদী ব্যবস্থাপনা, আন্তঃদেশীয় পানি সহযোগিতা এবং পানি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটিকে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্মেলনে পানিকে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনার ওপর জোর দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ ছাড়া জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।
তৃণমূল থেকে বৈশ্বিক পরিসরে একশনএইডের দীর্ঘ পথচলা
২০১৬ সাল থেকে একশনএইড বাংলাদেশ পানি অধিকার, জেন্ডার ন্যায়বিচার ও জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, উপকূলীয় লবণাক্ততা আক্রান্ত অঞ্চল এবং নগর বস্তির পানি সংকট—সব ক্ষেত্রেই সংস্থাটির গবেষণা ও আন্দোলনভিত্তিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ও প্রত্যাশা সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো— জবাবদিহিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হবে জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনায় গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করা। পানি ন্যায়বিচার প্রসারে ওয়াটার মিউজিয়াম (পানি জাদুঘর)–এর মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূমিকা তুলে ধরা সম্মেলন শেষে একটি সমন্বিত নীতিপত্র প্রণয়ন, যা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেবে। দুই দিনের কর্মসূচির সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
প্রথম দিন (২১ জানুয়ারি): উদ্বোধনী অধিবেশনে দক্ষিণ এশিয়ায় পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব এবং জাতিসংঘ পানি কনভেনশন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানি ন্যায়বিচার শহর ও পানির ভবিষ্যৎ এদিন বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পানি জাদুঘরের ডিজিটাল প্রদর্শনীও প্রদর্শিত হবে, যা পানি ও সংস্কৃতির আন্তঃসম্পর্ক তুলে ধরবে। দ্বিতীয় দিন (২২ জানুয়ারি):
আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে— পানি ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উদ্ভাবন আন্তঃসীমানা পানি ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি
সমাপনী অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে ‘জবাবদিহিতামূলক পানি শাসন বিষয়ক ঢাকা ঘোষণা’, যা স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিনিধি সাকিব মাহমুদ এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. হাসিব মো. ইরফানুল্লাহ।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশ নিচ্ছেন ভারতের ডা. মানসী বাল ভার্গব, পাকিস্তানের ফাইয়াজ বাকির, জাতিসংঘ পানি কনভেনশন সেক্রেটারিয়েটের রেমি কিন্না, অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের জল ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. জন ডোরসহ ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া সম্মেলনে মরক্কোর প্রথম ওয়েসিস ইকোমিউজিয়াম এবং বাংলাদেশের চকরিয়া পানি জাদুঘর নিয়ে বিশেষ উপস্থাপনা থাকবে, যা পানি সংরক্ষণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় জ্ঞানের গুরুত্ব তুলে ধরবে।
No comments yet. Be the first to comment!