আইন-আদালত

নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব: আইনমন্ত্রী

আপডেট: আগ ২৫, ২০২৬ : ০৫:৫২ এএম
নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব: আইনমন্ত্রী

নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে এবং এ অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে। সমালোচনা ও পরামর্শের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সরকার সামনে এগিয়ে যেতে চায় এবং সংস্কারের যৌক্তিক জায়গায় পৌঁছাতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসূচি পালন করবে এবং সরকারের সমালোচনা করবে—এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে।

মতপ্রকাশের কারণে লেখক, সাংবাদিক, কার্টুনিস্টসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হয়রানি বা গ্রেপ্তারের অতীত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

‘প্রয়োজনে আইন সংশোধনে সরকার উন্মুক্ত’

আইনমন্ত্রী বলেন, আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রে সরকার কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় মনে করে না। কোনো আইন বাস্তবে প্রয়োগের পর সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিলে তা সংশোধনের জন্য সরকার উন্মুক্ত থাকবে। মানুষের প্রয়োজনেই আইন প্রণীত হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংশোধন করা যায়।

মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। গুমের ঘটনাকে সাধারণ অপরাধ এবং ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য করে বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রকৃত তথ্য গোপন করলে বা ভুল তথ্য দিলে জবাবদিহির প্রশ্নও আসবে। এর মাধ্যমে দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংবিধান সংস্কারে মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার কথা

সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই যেকোনো সংশোধন করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন বিচারিক সিদ্ধান্তেও মৌলিক কাঠামোর বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে।

বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনের বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জুলাই সনদের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের প্রয়োজন রয়েছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যৌক্তিক প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনা করে সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার সুযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনমূলক অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকর ভারসাম্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবিধানের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত বিধান এবং বিচার বিভাগের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা। বিচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিচারিক আদেশের বিষয়ে আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপিল বা রিভিশনের সুযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুততম সময়ে নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে সরকারের লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংস্কারের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা ও যৌক্তিক পরামর্শকে স্বাগত জানানো হবে।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, পিছনে ফিরতে চাই না।’ সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম ও আইন পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

আলোচনায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক জবাবদিহি, সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!