অপরাধ ও দুর্নীতি

আসিফ মাহমুদের সময়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ-পদোন্নতির নথি দুদকে

আপডেট: সেপ্টে ১৪, ২০২৬ : ০৫:৫৫ এএম
আসিফ মাহমুদের সময়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ-পদোন্নতির নথি দুদকে

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৌঁছেছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর নথিপত্র তলব করে দুদকের দেওয়া চিঠির পর মন্ত্রণালয় থেকে এসব কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সোমবার দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধানের স্বার্থে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে নথিপত্র চাওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ নথি পাওয়া গেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে আইন ও বিধির ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না, তা দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হবে।

এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এ জন্য দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়।

পরদিন অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চার ধরনের নথি চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় দুদক। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি–সংক্রান্ত নথি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূলে বদলি–সংক্রান্ত নথিও রয়েছে।

নতুন অভিযোগে অনুসন্ধান

এদিকে গতকাল রোববার আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য ও অর্থ পাচারসহ নতুন একাধিক অভিযোগের বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ বলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান। নতুন অভিযোগগুলোও যাচাই-বাছাই শেষে আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্ত করা হবে।

নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে বাণিজ্য, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার থেকে কমিশন নেওয়া এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পর্তুগালে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে।

দুদক জানায়, নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের তালিকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ও রয়েছে।

এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া এবং বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার আসিফ মাহমুদের

দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে রোববার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ অস্বীকার করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগের অঙ্ক নিয়ে দুদক ও সরকারের নিজেদের মধ্যে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, কখনো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, আবার কখনো ১১ হাজার কোটি টাকা এবং কয়েক দিন আগে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার কথা বলা হয়েছে। এভাবে অভিযোগের অঙ্ক পরিবর্তন হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, সরকার কাউকে ধরতে চাইলে বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে এবং দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।

দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম রয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশও দেন তিনি।

তবে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!