কারও বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। কেউ ছোটবেলাতেই হারিয়েছে বাবাকে, কেউ মাকে। আবার কারও জীবনে বাবা-মা দুজনেরই কোনো স্মৃতি নেই। কেউ পরিবার থেকে হারিয়ে গেছে, কেউ দারিদ্র্যের কারণে ঠাঁই পেয়েছে অনাথ আশ্রমে। আপনজনের স্নেহ-ভালোবাসা কিংবা পরিচিত পারিবারিক পরিবেশ—কোনোটিই তাদের শৈশবের সঙ্গী হয়নি।
তবে প্রতিকূলতা তাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। অনিশ্চিত শৈশব পেরিয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা নয় বালক। ফল প্রকাশের পর তাদের চোখেমুখে যেমন ছিল আনন্দ, তেমনি ছিল স্বজন হারানোর দীর্ঘদিনের শূন্যতা।
উত্তীর্ণ নয়জন হলেন সাকিব হাওলাদার, সুমন মিয়া, আল-আমিন, সাকিব, নিরব ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, মেহেদি হাসান, আনিছুর ইসলাম ও আলিউল ইসলাম। তারা সবাই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। অনাথ, ছিন্নমূল, বঞ্চিত ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৬০ শিশু রয়েছে।
সোমবার বিকেলে শিশু নগরীতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি বড় ভবনের মাঝখানে বিশাল খেলার মাঠ। কেউ খেলছে, কেউ বই নিয়ে বসে আছে। এরই মধ্যে এসএসসি পাস করা নয় বালকের মুখে ছিল আলাদা উচ্ছ্বাস। সাফল্যের আনন্দের পাশাপাশি কারও কারও কথায় উঠে আসে হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।
পরিবারের কোনো ঠিকানাই জানা নেই সুমনের
সুমন মিয়া ছয় বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এরপর একটি সেন্টারে থাকার পর ২০১৫ সালে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আসে। গত প্রায় ১০ বছর এখানেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর।
সুমন বলে, ‘ছয় বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে যাই। কোথা থেকে হারিয়েছি, সেটাও মনে নেই। পরে একটি সেন্টারে ছিলাম। সেখান থেকে মালেক স্যারের মাধ্যমে ২০১৫ সালে এখানে আসি। এখানে ১০ বছর পড়াশোনা করার পর এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। খুব ভালো লাগছে।’
কথার একপর্যায়ে পরিবারের প্রসঙ্গ উঠতেই ভারী হয়ে আসে সুমনের কণ্ঠ। সে বলে, ‘হয়তো আমার পরিবার আমার সঙ্গে থাকলে তারাও অনেক খুশি হতো। কিন্তু তারা আমার সঙ্গে নেই। তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে, তাও জানি না। আমার পরিবারের কোনো ঠিকানাও নেই।’
‘বড় হয়ে ভালো মানুষের মতো মানুষ হতে চাই’
নিরব হাসানও প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে রয়েছে। সেখান থেকেই পড়াশোনা করে পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছে সে।
নিরব বলে, ‘আমি ১০ বছর ধরে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আছি। এখান থেকে পড়াশোনা করে এসএসসি পাস করেছি। আমি খুব খুশি।’
ভবিষ্যতে কী হতে চায়—এমন প্রশ্নের জবাবে নিরবের সহজ উত্তর, ‘বড় হয়ে একজন ভালো মানুষের মতো মানুষ হতে চাই।’
বাবাকে হারিয়ে আশ্রয় মিশনে
আনিছুর ইসলামের ছোটবেলাতেই বাবা মারা যান। সংসারের অভাবের কারণে তাঁর মা ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে আহছানিয়া মিশনের কথা জানতে পেরে আনিছুরকে সেখানে ভর্তি করান।
আনিছুর বলে, ‘ছোটবেলায় আমার বাবা মারা যান। আমার মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে এই মিশনের কথা জানতে পেরে আমাকে এখানে পাঠান, যেন আমি ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারি এবং মানুষের মতো মানুষ হতে পারি।’
প্রায় ১১ বছর ধরে শিশু নগরীতে থাকা আনিছুর এবার এসএসসি পরীক্ষায় ৪.০০ পয়েন্ট পেয়েছে।
মায়ের অসহায়ত্বে মেহেদির নতুন ঠিকানা
মেহেদি হাসানের বাবাও মারা যান ছোটবেলায়। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচ বহন করা তাঁর মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। পরে মেহেদিকে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে নিয়ে আসেন তিনি।
মেহেদি বলে, ‘বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন। তখন মা সংসার চালাতে পারছিলেন না, আমাকে পড়াশোনাও করাতে পারছিলেন না। পরে এখানে নিয়ে আসেন। স্যাররা পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া ও থাকার সব ব্যবস্থা করেছেন। এখানে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি। সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে ভালো ফল করেছি।’
প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে রয়েছে মেহেদি।
বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছানোর আকুতি আল-আমিনের
আল-আমিন ইসলাম সাত বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে যায়। এরপর আর বাবা-মাকে খুঁজে পায়নি সে। এসএসসি পাসের আনন্দের দিনেও সেই শূন্যতার কথা মনে পড়ে তার।
আল-আমিন বলে, ‘আজকের ফলাফল শুধু আনন্দের নয়, এর সঙ্গে একটা কষ্টও আছে। যদি আজ আমার বাবা-মা আমার পাশে থাকতেন, তাহলে ভালো লাগত। অন্যদের বাবা-মা সন্তানদের পরীক্ষা দেওয়ার সময় পাশে থাকেন, ফলাফল হলে খুশি হন। আমিও তো তাঁদের ছেলে। আমি পাস করেছি, তাঁরা যদি জানতে পারতেন, তাঁরাও নিশ্চয়ই খুশি হতেন।’
ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের লক্ষ্য ঠিক করে রেখেছে আল-আমিন। সে বলে, ‘বড় হয়ে একজন সুনাগরিক হতে চাই। সৎভাবে চলতে চাই। যে কাজই করি, তাতে কোনো দুই নম্বরি থাকবে না। সবসময় সত্যের পথে চলব।’
রেলস্টেশন-ফেরিঘাট থেকে শিশুদের আশ্রয়
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন, ফেরিঘাট, নদীভাঙনকবলিত এলাকা ও হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিশুদের এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়। যাদের বাবা-মা নেই কিংবা যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, তাদের শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা শিশুদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলছি। এবারের ফলাফলও ভালো হয়েছে। এভাবেই শিশুরা এখানে সুরক্ষিতভাবে বেড়ে উঠছে।’
গত পাঁচ বছরে এসএসসি পাস ৪৮ শিশু
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় বলেন, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতিম ও পথশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে আমাদের এখান থেকে ৪৮ জন শিশু এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। অনেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবারও ভালো ফল হয়েছে।’
শিশুদের ভালো ফলের পেছনে নিয়মিত পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন দীপক কুমার রায়। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। এখানে শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে তারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে। তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়।
তিনি জানান, ২০২১ সাল পর্যন্ত দাতা সংস্থার অর্থায়নে শিশু নগরীর কার্যক্রম চললেও বর্তমানে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের লালন-পালন ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
দীপক কুমার রায় বলেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পাশে দাঁড়ালে শিশুদের আরও ভালোভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তাঁদের লক্ষ্য, শিশু নগরী থেকে বের হয়ে এসব শিশু দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে সমাজে ফিরে যাবে এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!