সারাদেশ

ভালুকায় বটগাছের নিচে টিকে আছে শতবছরের ঐতিহ্য

আপডেট: আগ ১৬, ২০২৬ : ০৫:২৯ এএম
ভালুকায় বটগাছের নিচে টিকে আছে শতবছরের ঐতিহ্য

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ী বাজার তখনও মানুষের ভিড়ে জমজমাট। কেউ ব্যস্ত কেনাকাটায়, কেউ ঘুরে দেখছেন হাটের পসরা। এরই মধ্যে বাজারের এক কোণে বিশাল একটি বটগাছের নিচে বসে আছেন কয়েকজন নরসুন্দর।

কারও হাতে কাঁচি, কারও হাতে ক্ষুর। সামনে ছোট আয়না, পাশে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। খোলা আকাশের নিচেই চলছে চুল-দাঁড়ি কাটার কাজ। শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেল, আধুনিকতার ছোঁয়ায় চারপাশের জীবনযাত্রা বদলে গেলেও মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলার নরসুন্দরদের হাট এখনো ধরে রেখেছে পুরোনো ঐতিহ্য। প্রতি শনিবার বসা সাপ্তাহিক হাটের অন্যতম আকর্ষণ এই বটতলা।

শহর কিংবা গ্রামে এখন অসংখ্য আধুনিক সেলুন। ঝকঝকে চেয়ার, বড় আয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও নানা ধরনের সেবা সেখানে নিত্যদিনের চিত্র। কিন্তু এসবের বাইরে মল্লিকবাড়ীর বটতলায় কয়েকটি কাঁচি, ক্ষুর ও পুরোনো আয়না নিয়েই দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন নরসুন্দররা।

তাঁদের কাছে এই জায়গা শুধু উপার্জনের স্থান নয়, জীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের অংশ।

পাকিস্তান আমল থেকে পেশায়

ত্রিশালের বগারবাজার এলাকার রায়মন চন্দ্র শীলের বয়স প্রায় ৭০ বছর। পাকিস্তান আমল থেকে নরসুন্দর পেশার সঙ্গে যুক্ত তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে এই পেশার নানা পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন।

রায়মন চন্দ্র শীল বলেন, ‘আমি পাকিস্তান আমল থেকে কাজ করছি। তখন হাতে কাজ থাকত, পকেটেও টাকা থাকত। এখন শুধু হাটের দিনটাতেই কাজ পাই। বাকি সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করতে হয়। আগে দিনে সাত-আটশ টাকা আয় হতো, এখন আর তেমন হয় না।’

ভালুকার তামাট গ্রামের ইন্দ্রমোহনের বয়স ৭০ পেরিয়েছে। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে মল্লিকবাড়ী বাজারে বসছেন তিনি। তাঁর চোখেও ধরা পড়েছে সময়ের পরিবর্তন। একসময় খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হলেও এখন কাজের অপেক্ষায় অনেকটা সময় কেটে যায়।

তবু পুরোনো জায়গাটি ছাড়েননি ইন্দ্রমোহন। কারণ এই বটগাছ, বাজার আর এখানকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

তরুণেরাও আসছেন বটতলায়

আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে নরসুন্দর পেশাও। তবে ঐতিহ্যের এই ধারায় পুরোপুরি ছেদ পড়েনি। তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ এখনো পুরোনো এই পেশার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখছেন।

ভালুকার পাঁচগাঁও হাজির বাজারের ২৪ বছর বয়সী সুমন শীল নিজের এলাকায় একটি সেলুন পরিচালনা করেন। এরপরও প্রতি শনিবার তিনি চলে আসেন মল্লিকবাড়ী বাজারে। আধুনিক সেলুনে কাজ করার সুযোগ থাকলেও বটতলার এই হাটের প্রতি তাঁর আলাদা টান।

সুমন শীল বলেন, ‘এই বাজারের খদ্দেররা পুরোনো। এখানকার পরিবেশের একটা আলাদা টান আছে।’

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে কাঁচি হাতে

মল্লিকবাড়ী বাজারের সবচেয়ে প্রবীণ নরসুন্দর নুর মোহাম্মদের বয়স ৭৪ বছর। মাত্র ১০ বছর বয়সে এই বাজারে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে ছয় দশকেরও বেশি সময়।

এর মধ্যে বদলে গেছে বাজারের চেহারা, মানুষের রুচি ও জীবনযাপন। বয়স বেড়েছে নুর মোহাম্মদেরও। কিন্তু তাঁর হাতে এখনো কাঁচি ওঠে।

নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘আগে সকাল থেকেই খদ্দেরের সারি লেগে থাকত। এখন আর সেই ভিড় নেই। তবে এখনো প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ টাকার মতো আয় হয়।’

পুরোনো খদ্দেরের আস্থাও আছে

এই বটতলার নিয়মিত খদ্দেরদের একজন ৯০ বছর বয়সী ফয়েজ উদ্দিন। বহু বছর ধরে এখানেই চুল-দাঁড়ি কাটান তিনি। বয়সের ভারে চলাফেরা ধীর হয়ে এলেও পুরোনো জায়গাটির প্রতি তাঁর আস্থা অটুট।

ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘সেলুনে গেলে বেশি টাকা লাগে। কিন্তু এখানে কম খরচে ভালো কাজ হয়। তাই এখনো এখানে আসি।’

শুধু ফয়েজ উদ্দিন নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষের কাছেই বটতলার নরসুন্দররা পরিচিত মুখ। বছরের পর বছর একই জায়গায় বসে কাজ করার কারণে খদ্দেরদের সঙ্গে তাঁদের তৈরি হয়েছে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক। কেউ নিয়মিত আসেন, আবার কেউ দূরের গ্রাম থেকে হাটের দিনটি মিলিয়ে চলে আসেন।

বটতলায় যেন সময়ের দুই প্রান্ত

মল্লিকবাড়ী বাজারের এই বটতলা তাই কেবল চুল-দাঁড়ি কাটার জায়গা নয়। এটি বহু মানুষের জীবিকার অবলম্বন, পুরোনো একটি পেশার স্মৃতিচিহ্ন এবং গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ছবি।

একটি পুরোনো বটগাছের ছায়ায় বসে থাকা কয়েকজন নরসুন্দর যেন সময়ের দুই প্রান্তকে পাশাপাশি ধরে রেখেছেন। একদিকে আধুনিক সেলুনের ঝলমলে জগত, অন্যদিকে কাঁচি, ক্ষুর আর আয়না নিয়ে টিকে থাকা পুরোনো পেশা।

সময়ের সঙ্গে তাঁদের আয় কমেছে, খদ্দের কমেছে, বদলে গেছে মানুষের অভ্যাসও। তারপরও প্রতি শনিবার তাঁরা বটগাছের নিচে পসরা সাজিয়ে বসেন। অপেক্ষা করেন পরিচিত মুখগুলোর জন্য।

ডিজিটাল যুগ ও আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এমন দৃশ্য এখন খুব বেশি দেখা যায় না। মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলার এই নরসুন্দরদের হাট তাই শুধু একটি পেশার গল্প নয়; এটি গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।

প্রতি শনিবার কয়েক ঘণ্টার জন্য জমে ওঠা এই হাটে কাঁচির শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে বহু পুরোনো দিনের স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই জীবিকার আশায় এখনো বটগাছের নিচে বসেন নরসুন্দররা।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!