সারাদেশ

কোটি টাকা ব্যয়েও চট্টগ্রামে কমেনি মশার উপদ্রব, বাড়ছে ডেঙ্গু

আপডেট: আগ ২০, ২০২৬ : ০৫:৫১ এএম
কোটি টাকা ব্যয়েও চট্টগ্রামে কমেনি মশার উপদ্রব, বাড়ছে ডেঙ্গু

মশক নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও চট্টগ্রাম নগরীতে কমছে না মশার উপদ্রব। বরং বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে এডিস মশার বিস্তার, সেই সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বও পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক মাত্রায়।

আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি এবং এসব রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। মারা গেছেন তিনজন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩৬ জন। আগস্টের প্রথম ১৯ দিনে নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬৬৩ জনের। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।

চট্টগ্রামে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩ জনে। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৭৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন আক্রান্ত হন। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে ৫৩৬ জনে পৌঁছায়। ওই মাসে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়।

জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র

চট্টগ্রাম নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রাক্‌-বর্ষা জরিপে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব আশঙ্কাজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।

৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স পাওয়া গেছে ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। আর ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

জরিপে উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশক নিধন কার্যক্রমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ব্যয় কম নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে সংস্থাটি। এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

তবে এত অর্থ ব্যয়ের পরও নগরীর চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রব কমেনি বলে অভিযোগ করছেন।

৭০ লাখ মানুষের জন্য ৩৫৫ কর্মী

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। সংস্থাটির দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনেও মশার ওষুধ ছিটানোর কর্মীদের দেখা যায় না।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নগরীর প্রায় ৭০ লাখ মানুষকে মাত্র সাড়ে তিনশো কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তবুও তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা মারার চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই ফগার মেশিনে ধোঁয়া ছিটানোর চেয়ে মশার লার্ভা ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, তাদের প্রজননস্থল কোথায় এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব তথ্য নিয়মিত পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, চসিকের মশা নিধন কার্যক্রমে বড় ঘাটতি হলো কীটতত্ত্ববিদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা না থাকা। বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ছাড়া বড় বাজেট বরাদ্দ করেও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে মশার মধ্যে প্রচলিত কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে কোন ওষুধে লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা কার্যকরভাবে ধ্বংস হচ্ছে, তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা প্রয়োজন।

চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। পাশাপাশি ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রয়েছে।

বিশ্ব মশা দিবসে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনসহ আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণে নগরবাসীকেও ভূমিকা রাখতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর উপায়।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!