ফজরের আজান শেষ হতে না হতেই জমে ওঠে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া পৌরসদরের পাটমহালের পানের হাট। ভোরের নীরবতা ভেঙে সেখানে শুরু হয় চাষি ও পাইকারদের ব্যস্ততা। কেউ বরজ থেকে তুলে আনা পান সাজিয়ে বসেছেন, কেউ ব্যস্ত দরদামে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারেরা পান কিনে বস্তা ও গাড়ি ভর্তি করছেন।
ভোরের হাটটি জমে ওঠার পর মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় বেচাকেনা। এই অল্প সময়েই এখানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। শীত মৌসুমে পানের চাহিদা ও দাম বাড়লে প্রতিটি হাটে বেচাকেনার পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
পাটমহালের এই হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন—শনিবার ও বুধবার। পাকুন্দিয়ার স্থানীয় চাষিদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও কৃষকেরা এখানে পান নিয়ে আসেন। আর ভালো মানের পান কিনতে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারেরা ছুটে আসেন এই হাটে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভোরে সরেজমিনে দেখা যায়, হাটজুড়ে মানুষের ভিড়। এক পাশে চাষিরা পান সাজিয়ে বসেছেন। কোথাও চলছে দরদাম, কোথাও পাইকারেরা পান বাছাই করছেন। কেউ মাথায়, কেউ ভ্যানে, আবার কেউ অটোরিকশায় করে পান নিয়ে আসছেন। কেনাবেচা শেষে পানের বস্তা ও আঁটি নিয়ে অটোরিকশা ও পিকআপভ্যান ছুটছে বিভিন্ন গন্তব্যে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে পাকুন্দিয়ার পান
পাটমহালের হাট এখন শুধু স্থানীয় চাষিদের পান বিক্রির জায়গা নয়, এটি পাকুন্দিয়ার পান বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানকার পান যাচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, কটিয়াদী, নরসিংদী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে।
পাইকারেরা জানান, পাকুন্দিয়ার পানের মান ভালো। বিশেষ করে লাল ডিঙ্গি ও গয়েসুর জাতের পানের চাহিদা বেশি। ভালো মানের এককুড়ি পান বর্তমানে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এককুড়িতে ২০ বিরা এবং প্রতি বিরায় ১২০টি পান থাকে।
কটিয়াদীর গচিহাটা থেকে পান কিনতে আসা হাবিবুর রহমান বলেন, ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে তিনি এই হাট থেকে পান কিনছেন। এখানকার পানের মান ভালো হওয়ায় তিনি নিয়মিত পান কিনে মালিকখালী, গচিহাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি বিক্রি করেন।
পান ব্যবসায়ী শুভ চক্রবর্তী বলেন, তাঁর নিজস্ব আড়ত রয়েছে। পাকুন্দিয়া থেকে পান কিনে কটিয়াদী, ভৈরব, নরসিংদী, করগাঁও ও নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, এই হাটে বিভিন্ন জাত ও মানের পান পাওয়া যায়। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ হাটের ওপর নির্ভর করছেন।
পানচাষেই চলছে অনেক পরিবারের সংসার
পাকুন্দিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পান চাষ হয়ে আসছে। দরদরা, বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া, নামালক্ষীয়া, সৈয়দগাঁও, হোসেন্দী চরপাড়া, মির্জাপুর ও বাহাদিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে পানের বরজ।
অনেক পরিবারের পান চাষের ইতিহাস বাপ-দাদার সময়ের। একটি পানের বরজকে কেন্দ্র করেই চলছে একটি পরিবারের সংসার। অন্য অনেক ফসলের তুলনায় পান চাষ লাভজনক হওয়ায় নতুন করেও অনেকে এ চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
হিজলীয়া গ্রামের পানচাষি সাহিদ মিয়া বলেন, তাঁর বাবা ও দাদাও পান চাষ করেছেন। এখন তিনিও পান চাষ করছেন। প্রতিবেশীদের অনেকেও পান চাষের সঙ্গে যুক্ত। এই চাষের আয় দিয়েই তাঁর পরিবারের সংসার চলে।
নামালক্ষীয়া গ্রামের পানচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, তাঁর বাবা-দাদারাও পান চাষ করেছেন। তিনিও প্রায় ৪০ বছর ধরে পান চাষ করে পাকুন্দিয়া বাজারে বিক্রি করছেন। পান চাষের আয় দিয়েই পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলছেন তিনি।
চাষিরা বলেন, উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা ভালো থাকলে সারা বছরই পান থেকে আয় করা সম্ভব। তবে রোগবালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো গেলে পান চাষ স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
জায়গা পেতে আগের দিনই হাটে আসেন চাষিরা
হাট বসে ভোরে। তবে ভালো জায়গা নিশ্চিত করতে অনেক পানচাষি আগের দিন বিকেলেই হাটে চলে আসেন। কেউ কেউ পান নিয়েই রাত কাটান হাটে। হাটের ইজারাদারদের পক্ষ থেকে তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
হাটের ইজারাদার কফিল উদ্দিন বলেন, পান দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই দূর-দূরান্ত থেকে আসা চাষি ও পাইকারদের সুবিধা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাটে পর্যাপ্ত পাহারাদার রাখা হয়। খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও চাষি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি না করার চেষ্টা করা হয়।
৬৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পাকুন্দিয়ার চরফরাদী, এগারসিন্দুর, হোসেন্দী, নারান্দী ও সুখিয়া ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বরাটিয়া, হিজলীয়া, লক্ষীয়া ও সৈয়দগাঁও এলাকায় পান চাষ হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ রয়েছে।
সারা বছরই এসব এলাকায় লাল ডিঙ্গি ও গয়েসুর জাতের পান উৎপাদন হয়। স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের উপযোগী হওয়ায় ভালো মানের পান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূর-ই-আলম বলেন, পান একটি লাভজনক কৃষিপণ্য। বছরজুড়েই কৃষকেরা পান বিক্রি করে আয় করছেন। এ কারণে দিন দিন এ চাষের পরিধি বাড়ছে। পান চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
ভোরে জমে ওঠা পানের হাটটি শেষ হয় মাত্র দুই ঘণ্টায়। তবে এই স্বল্প সময়ের বেচাকেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। পাকুন্দিয়ার পানবরজ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজার পর্যন্ত কৃষক, পাইকার, ব্যবসায়ী ও পরিবহনশ্রমিক—অনেকের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই হাট।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!