সারাদেশ

দিনাজপুরে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকেরা, ভালো দামের আশা

আপডেট: অক্টো ২২, ২০২৬ : ০৪:৫৭ এএম ৫ ০
দিনাজপুরে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকেরা, ভালো দামের আশা

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে দিনাজপুরে আগাম জাতের শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে মৌসুমের আগেই সবজি বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা। ইতিমধ্যে কিছু আগাম সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে। চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় আশাবাদী কৃষকেরা।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান গতকাল বুধবার বাসসকে বলেন, দিনাজপুরকে দেশের শস্যভান্ডার বলা হয়। জেলার সব উপজেলাতেই বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদিত হয়। চলতি বছর কৃষকেরা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করছেন। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজি তুলতে পারলে তাঁরা বেশি লাভের আশা করছেন।

সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ে। তখন বাজারে সবজির পরিমাণ বেশি থাকায় অনেক সময় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পান না। এ কারণে বর্ষার শেষ দিকে, কার্তিক মাসের শুরুতেই আগাম সবজি বাজারজাত করার প্রস্তুতি নেন তাঁরা। এবারও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে উঁচু জমি প্রস্তুত করে চাষাবাদ শুরু করেছেন কৃষকেরা।

আগাম সবজিতে লাভের আশা

সম্প্রতি দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর কর্ণাই, গোলাপগঞ্জ, সুন্দরবন, ফাজিলপুর ও আউলিয়াপুর গ্রামের সবজিখেত ঘুরে কৃষকদের ব্যস্ততা দেখা গেছে। কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপি, কোথাও বেগুন, টমেটো, শিম ও শসার পরিচর্যা চলছে।

সদর উপজেলার কর্ণাই গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪২) এবার ৬০ শতক জমিতে তিন ভাগে আগাম জাতের সবজি চাষ করেছেন। তাঁর খেতে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁঠালি বেগুন ও টমেটো।

রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পর আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি থেকে সবজি চাষ শুরু করেছেন তিনি। এখন গাছগুলো বেশ বড় হয়েছে। তবে অসময়ে বৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় খেতে তিন ফুট পরপর নালা কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছেন। এতে বৃষ্টির পানি সহজেই বের হয়ে যাচ্ছে এবং জলাবদ্ধতার কারণে ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি কমেছে।

রফিকুলের আশা, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তাঁর খেতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো ও মুলা বাজারে তোলা যাবে। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে সবজি বিক্রি করতে পারলে ভালো দাম পাবেন বলে মনে করছেন তিনি।

সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক (৪৮) বলেন, কয়েক বছর ধরে তাঁরা কয়েকজন কৃষক আগাম জাতের শীতকালীন সবজি চাষ করছেন। এ পদ্ধতিতে লাভবান হওয়ায় এবারও কয়েক ধরনের সবজি আবাদ করেছেন তাঁরা।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করায় তাঁদের পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচ—দুটিই কমেছে। মৌসুমের আগেই সবজি বিক্রি করে এবারও ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।

৩২ শতক জমিতে ফুলকপি, খরচ ২৫ হাজার টাকা

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর গ্রামের কৃষক সহিদ মিয়া (৩৮) এবার ৩২ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। তাঁর হিসাবে, এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ২১ হাজার টাকা। বাজারজাত করা পর্যন্ত মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ২৫ হাজার টাকায়।

সহিদ মিয়া বলেন, আগামী আট থেকে ১০ দিনের মধ্যে খেতের ফুলকপি বাজারে তোলার আশা করছেন তিনি। গত বছর একই জমিতে ফুলকপি বিক্রি করে পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এবার ফলন ভালো হওয়ায় আরও বেশি লাভের প্রত্যাশা করছেন তিনি। ফুলকপির পাশাপাশি শিম ও শসাও চাষ করেছেন।

কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ

ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বাসসকে বলেন, আগাম জাতের সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় এ পদ্ধতির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দিনাজপুরে উৎপাদিত সবজি বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ এবং রোগবালাই দমনে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের সবজি চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া এ বছর ৩৬ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ব্যবহারের ফলে সবজি চাষসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকেরা এগিয়ে যাচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!