বাংলাদেশের কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে ভর্তুকি নির্ভরতা কমিয়ে গবেষণা, কৃষি পরামর্শসেবা, সেচ, বাজার সংযোগ এবং জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটি বলেছে, কৃষিতে লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর সরকারি ব্যয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সোমবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ কৃষি খাতে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়, যা খাতটির প্রতি সরকারের উচ্চ অগ্রাধিকার নির্দেশ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার গতি কমে গেছে এবং উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যে বৈচিত্র্য আনার অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
‘রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই ভর্তুকি ও ধানকেন্দ্রিক সহায়তায় ব্যয় হচ্ছে। এর বিপরীতে গবেষণা, সম্প্রসারণ সেবা, সেচ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ু সহনশীলতা উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশই সার ভর্তুকিতে ব্যয় হয়। এই ভর্তুকি খাদ্য উৎপাদন ও মূল্য স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখলেও এর সুবিধা সমানভাবে বিতরণ হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভর্তুকি ব্যবস্থার কারণে বড় জমির মালিকরাই বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ ভূমির মালিক মোট সার ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা ভোগ করেন, যেখানে নিচের ৪০ শতাংশ কৃষক পান মাত্র ১৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে সারের ব্যবহারেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রায় সুষম পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করেন। এ অবস্থার উন্নতি করা গেলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, কৃষি বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাসের কেন্দ্রবিন্দু হলেও জলবায়ু ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা নীতিগত দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, সহায়তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ধীরে ধীরে উচ্চ ফলনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে বাংলাদেশ আরও উৎপাদনশীল ও সহনশীল কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা ভালো মানের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে।
প্রতিবেদনে ধাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয় এবং সার ভর্তুকির বড় অংশও এই খাতে যায়। অথচ মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, শাকসবজি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে আয় ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে ধাপে ধাপে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষি পরামর্শসেবা জোরদার এবং কৃষক কার্ড ও ই-ভাউচার ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়িয়ে সাশ্রয় হওয়া অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষির আধুনিকায়ন ও বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের সহলেখক মনসুর আহমেদ বলেন, সার ভর্তুকির নকশা ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন করলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, মাটির উর্বরতা উন্নয়ন এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!