অর্থনীতি

আমদানি লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন সমন্বিত নির্দেশনা

আপডেট: আগ ১৪, ২০২৬ : ০৪:৪৮ এএম
আমদানি লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নতুন সমন্বিত নির্দেশনা

আমদানি লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশনা একত্র করে নতুন সমন্বিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে গত বছরের আগস্টে জারি করা আগের সমন্বিত নির্দেশনা বাতিল হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ (এফইপিডি-১) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আগের সমন্বিত প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও আমদানি লেনদেন নিয়ে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো নতুন প্রজ্ঞাপনে একত্র করা হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নির্দেশিকার (জিএফইটি) দ্বিতীয় খণ্ডে থাকা প্রতিবেদন-সংক্রান্ত নির্দেশনা আগের মতোই বহাল থাকবে।

বড় আমদানিতে আগে তথ্য দিতে হবে

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে সব ধরনের অনুমোদিত আমদানি লেনদেনের তথ্য প্রতিদিন বা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন আমদানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (ওআইএমএস)-এ জমা দিতে হবে।

সরকারি আমদানি ছাড়া ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি মূল্যের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে ওআইএমএসে তথ্য দিতে হবে।

এ ছাড়া আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থান, আমদানি মূল্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং লেনদেনের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আমদানি-সংক্রান্ত নথিতে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণও উল্লেখ করতে হবে। এতে পণ্যের গুণগত মান, ব্র্যান্ড, উৎপাদনের তারিখ, মোড়ক, গ্রেড, একক মূল্য ও পরিমাণের পাশাপাশি প্রযোজ্য আট অঙ্কের এইচএস কোড দিতে হবে।

কিছু আমদানিতে ৩৬০ দিন পর্যন্ত ঋণসুবিধা

নতুন নির্দেশনায় এলপিজিসহ শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতে সরবরাহকারী বা ক্রেতার ঋণের আওতায় সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের ঋণসুবিধার সুযোগ রাখা হয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক সার আমদানিতেও একই সুবিধা প্রযোজ্য হবে।

এ ছাড়া যন্ত্রাংশ, জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য জাহাজ, ইস্পাত শিল্পের নির্দিষ্ট কাঁচামাল, ওষুধ শিল্পের সক্রিয় উপাদান এবং পরীক্ষাগারের রাসায়নিক উপকরণ আমদানিতে শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের ঋণসুবিধা রাখা হয়েছে।

জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং চক্ষু চিকিৎসায় ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের ঋণসুবিধা দেওয়া যাবে।

শিল্প খাতের আমদানিকারকদের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও মূলধনি পণ্য আমদানিতে সরবরাহকারী বা ক্রেতার ঋণের আওতায় সর্বোচ্চ তিন বছরের ঋণসুবিধার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে থাকা যোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ সুবিধা পাবে।

বিলম্বিত পরিশোধে সুদের সীমা

বিলম্বিত পরিশোধের ভিত্তিতে আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুদের সর্বোচ্চ হারও নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ ক্ষেত্রে এসওএফআর বা ইউরিবরের মতো আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক হারের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ অতিরিক্ত সুদ আরোপ করা যাবে।

আমদানি-ভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন বাড়াতেও ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর আওতায় ক্রেতার ঋণ, সরবরাহকারী অর্থায়ন ও পাওনা অর্থায়নের মতো ব্যবস্থা থাকবে।

ঋণযোগ্য আমদানিকারকদের ব্যাংকগুলো ঋণসুবিধা দিতে পারবে। একই সঙ্গে সরবরাহকারীদের অনুকূলে গৃহীত বিলও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ডিসকাউন্ট করা যাবে।

বাণিজ্য নথিতে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুযোগ

বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে আধুনিক করতে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা চালুর পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রয়োজনীয় যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আইনগত বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা সাপেক্ষে চালান ও পরিবহন নথিসহ ইলেকট্রনিক বাণিজ্য নথি ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদিত বাণিজ্য করিডোরের মাধ্যমে ঋণপত্র ও দলিলভিত্তিক আমদানি-রপ্তানি লেনদেনে ডিজিটাল নথি প্রক্রিয়াকরণের একটি পরীক্ষামূলক কাঠামো চালু করা হয়েছে। এর লক্ষ্য নিরাপদ, সমন্বিত ও আইনগতভাবে নির্ভরযোগ্য ইলেকট্রনিক বাণিজ্য নথির ব্যবহার বাড়ানো।

আমদানি দায় পরিশোধে গুরুত্ব

প্রজ্ঞাপনে আমদানি দায় সময়মতো পরিশোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এমনকি ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার লাইসেন্সও বাতিল করা হতে পারে।

আমদানিকারকদের অর্থ পরিশোধের চার মাসের মধ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সত্যায়িত বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে হবে। তবে ঋণসুবিধাভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রে এ বিষয়ে পৃথক বিধান রয়েছে।

পণ্য পরিবহন বা শুল্ক ছাড়ে বিলম্বের মতো যৌক্তিক কারণে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করা যাবে।

নতুন প্রজ্ঞাপনে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র, বিশেষায়িত ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক অভ্যন্তরীণ ঋণপত্র, বিকল্প বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা, সুদের হারজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ফরওয়ার্ড রেট চুক্তি এবং স্বর্ণ, রৌপ্য, গয়না ও মুদ্রা নোট আমদানির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের ২০(৩) ধারার ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!