অর্থনীতি

বন্ধ চিনিকল পর্যায়ক্রমে চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো হবে: বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান

আপডেট: আগ ১৫, ২০২৬ : ০৪:৪৪ এএম
বন্ধ চিনিকল পর্যায়ক্রমে চালু করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো হবে: বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান

 দেশের চিনি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. শামছুজ্জামান সুরুজ।

তাঁর ভাষ্য, এর মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিলে বিএসএফআইসির প্রধান কার্যালয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বন্ধ থাকা সরকারি চিনিকলগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান জানান, দেশে বর্তমানে ১৫টি সরকারি চিনিকল রয়েছে। এর মধ্যে ৬টির মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তবে এসব চিনিকলের আওতাধীন এলাকায় আখ চাষ অব্যাহত আছে। পর্যায়ক্রমে বন্ধ মিলগুলোকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করছে বিএসএফআইসি।

তিনি বলেন, বন্ধ চিনিকলগুলো চালু হলে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও আরও গতিশীল হবে।

শুধু চিনি উৎপাদন নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি

চিনিকলের সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরে বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, চিনিকল শুধু চিনি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়। এসব মিলের সঙ্গে লাখো আখচাষির জীবিকা জড়িত। একই সঙ্গে এগুলো গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাঁর মতে, চিনিকলগুলো হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় রাস্তাঘাট উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। ফলে একটি চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে শুধু শিল্প উৎপাদনই ব্যাহত হয় না, এর প্রভাব পড়ে পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে।

নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা

জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি চিনিকলগুলোর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শামছুজ্জামান সুরুজ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা পরিচালনা করলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ টাকা জ্বালানি ব্যয় হতো। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে সেই ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে আখের ছোবড়া বা ব্যাগাস ব্যবহার করে ‘কো-জেনারেশন’ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ঋণের সুদ ও ট্রেড গ্যাপ লোকসানের কারণ

সরকারি চিনিকলগুলোর লোকসানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান বলেন, ঋণের সুদ ও ‘ট্রেড গ্যাপ’ লোকসানের অন্যতম কারণ। তাঁর দাবি, বেসরকারি খাত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের সুবিধা পেলেও সরকারি চিনিকলগুলো সেই সুবিধা যথাযথভাবে পায় না।

এ বিষয়ে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, ঋণের সুদ ও শুল্কের বিষয়টি বাদ দিলে বিএসএফআইসির প্রকৃত লোকসান তেমন নেই। গত অর্থবছরেই করপোরেশনটি সরকারকে প্রায় ২১৩ কোটি টাকা আবগারি শুল্ক, কর ও ভ্যাট দিয়েছে।

লোকসান কমাতে নতুন নতুন বাই-প্রোডাক্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

আখচাষিদের দাম ও প্রণোদনা বেড়েছে

আখচাষিদের উৎসাহিত করতে আখের দাম ও প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে বলে জানান বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে প্রতি কুইন্টাল আখের দাম ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে চাষিদের প্রণোদনার পরিমাণ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ কোটি টাকা করা হয়েছে।

চাষিদের দ্রুত অর্থ পরিশোধের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে একটি পাইলট প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আখের ওজন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাষির মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের তথ্য জানানো হচ্ছে।

আগে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে অর্থ পেতে যে সময় লাগত, ডিজিটাল ব্যবস্থায় এখন তা দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। পাশাপাশি সফটওয়্যারের মাধ্যমে চাষিদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও চাষাবাদসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশবান্ধব চিনি শিল্প গড়ার পরিকল্পনা

পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারি চিনিকলগুলোর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শামছুজ্জামান সুরুজ। তিনি বলেন, চিনি শিল্পকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তাঁর দাবি, গবেষণায় দেখা গেছে, বিএসএফআইসি বছরে প্রায় ৬৬ হাজার ৪৫ টন কার্বন শোষণে অবদান রাখছে। এ ছাড়া ১০টি আখের ঝাড় একটি বড় বটগাছের সমপরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে।

শামছুজ্জামান সুরুজ বলেন, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব চিনি শিল্প গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। এই খাতকে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করাই তাঁদের লক্ষ্য।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!