অর্থনীতি

হংকংয়ে ২০০ কোটি ডলারের বাংলাদেশ তহবিল গঠনের উদ্যোগ: অর্থমন্ত্রী

আপডেট: আগ ২৩, ২০২৬ : ০৫:৩৮ এএম ১২
হংকংয়ে ২০০ কোটি ডলারের বাংলাদেশ তহবিল গঠনের উদ্যোগ: অর্থমন্ত্রী

অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পুঁজি দেশে আনার লক্ষ্যে হংকংয়ে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত এই তহবিল কোনো ঋণ নয়; এটি একটি ইকুইটি বিনিয়োগ তহবিল। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পুঁজি বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং সরকারের ওপর অতিরিক্ত ঋণের দায়ও তৈরি হবে না।

শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাইঅ্যানুয়াল ইকোনমিক স্টেট ইন এফওয়াই ২০২৬: ফিসকাল অ্যান্ড মনিটারি পার্সপেকটিভ অ্যান্ড প্রাইভেট সেক্টর এক্সপেকটেশনস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হংকংয়ে বিশেষ তহবিল

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা হংকংয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ তহবিল করতে যাচ্ছি। এটি হবে ২০০ কোটি ডলারের বাংলাদেশভিত্তিক তহবিল।’

অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের ওপর চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক পুঁজি সংগ্রহের বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত তহবিলটি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজি সংগ্রহের একটি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন দেশের পুঁজিবাজার দুর্বল অবস্থায় ছিল। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সুবিধা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ কারণে বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরির পাশাপাশি পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘আস্থা ফিরছে পুঁজিবাজারে’

আমীর খসরু বলেন, ‘দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশে কার্যকর পুঁজিবাজার বলতে তেমন কিছু ছিল না। তাই বিকল্প অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে আমরা পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি।’

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব এসেছে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এর সুফল ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে এবং বাজারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি বলব না যে পুঁজিবাজার পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে আস্থা ফিরছে। বাজার শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে এবং ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।’

তবে শুধু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরলেই হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভালো কোম্পানিগুলোকেও পুঁজিবাজারের ওপর আস্থা রাখতে হবে। কারণ, বাজারের প্রতি আস্থা থাকলেই ভালো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হয়ে মূলধন সংগ্রহে আগ্রহী হবে।

‘পুঁজিবাজার একসময় ক্যাসিনোতে পরিণত হয়েছিল’

দেশের পুঁজিবাজারের অতীত পরিস্থিতির সমালোচনা করে আমীর খসরু বলেন, একসময় এটি কার্যত ‘ক্যাসিনোতে’ পরিণত হয়েছিল। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একটি অংশ সুবিধা নিয়েছে।

সরকার এখন সেই সংস্কৃতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করে পুঁজিবাজারকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের সংস্কার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকদেরও আকৃষ্ট করছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা দেখছি, বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা এগিয়ে আসছেন। এটি খুবই ভালো খবর।’

ডলার, পান্ডা ও সামুরাই বন্ডে যাওয়ার পরিকল্পনা

বিদেশি অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করতে সরকার আরও কয়েকটি আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমরা ডলার বন্ডে যেতে চাই। পান্ডা বন্ড এবং সামুরাই বন্ডেও যাব।’

এসব উপকরণের মাধ্যমে দেশের ব্যাংক বা প্রচলিত অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বিশ্বের বিভিন্ন পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।

সরকারি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানো হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন আমীর খসরু।

তিনি বলেন, ‘বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা বেসরকারি খাত থেকে ঋণ নেওয়া কমানোর চেষ্টা করছি।’

সরকার ইতিমধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কিছুটা কমাতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকল্প অর্থায়নের দিকে পুরোপুরি যেতে সময় লাগবে। তবে এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

করের আওতা বাড়াতে চায় সরকার

কর ব্যবস্থার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যারা কর দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য নয়। বরং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন করদাতাদের আওতায় আনতে চায় সরকার।

তিনি বলেন, ‘যখন আমরা কর বাড়ানোর কথা বলি, তখন যারা ইতিমধ্যে কর দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর কর বাড়ানোর কথা বলছি না। আমরা করের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’

টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কর প্রশাসনে অটোমেশনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমীর খসরু বলেন, করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানো গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগও কমবে।

অর্থমন্ত্রী মনে করেন, পুঁজিবাজার পুনরুজ্জীবিত করা, আন্তর্জাতিক ইকুইটি তহবিল গঠন, বিভিন্ন ধরনের বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন এবং করের আওতা সম্প্রসারণ—এই উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের জন্য আরও টেকসই অর্থায়ন কাঠামো তৈরি হবে। এতে বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও শক্তিশালী হবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!