অর্থনীতি

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে: জেট্রো

আপডেট: আগ ৩০, ২০২৬ : ০৬:৫৫ এএম
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে: জেট্রো

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় দেশের বাজার ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নতুন করে মূল্যায়ন করছেন জাপানি কোম্পানিগুলো। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুইকি কাতাওকা।

সম্প্রতি বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতাওকা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা জাপানি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল। তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পাচ্ছে।

জেট্রোর ২০২৫ অর্থবছরের ‘বিদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি’ শীর্ষক জরিপের তথ্য তুলে ধরে কাতাওকা বলেন, বাংলাদেশে কার্যরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ ‘অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে’ বিনিয়োগের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে জাপানি ব্যবসায়ীদের কাছে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা যে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল, তা স্পষ্ট হয়েছে।

কাতাওকা বলেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কোম্পানিগুলোকে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশে জাপানি কর্মকর্তাদের সফর বাড়ছে

সম্প্রতি টোকিওতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয় এবং সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর বেড়েছে বলে জানান কাতাওকা।

তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ায় অনেক কোম্পানি বাংলাদেশের বাজারের সম্ভাবনা ও ব্যবসার সুযোগ নতুন করে মূল্যায়ন করছে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।

তবে শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বেড়ে যাবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেন তিনি।

কাতাওকা বলেন, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, লাইসেন্স ও অনুমতি প্রদান এবং আইন ও বিধিবিধানের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

‘সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক বিনিয়োগের’

বাংলাদেশ ও জাপানের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে কাতাওকা বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও শক্তিশালী বাণিজ্য ও বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারত্বে উন্নীত করতে হবে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু জাপান থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জাপানে বিনিয়োগকেও স্বাগত জানাবে জেট্রো।

কাতাওকার ভাষায়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একমুখী বিনিয়োগ উৎসাহিত করাই যথেষ্ট নয়। উভয় দেশের কোম্পানির বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেন বাড়িয়ে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে দুই দেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়।

ঢাকার ভোক্তা বাজারে আগ্রহ

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজারের প্রতি, বিশেষ করে ঢাকাকে কেন্দ্র করে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান কাতাওকা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪৬ শতাংশ আসে ঢাকা থেকে। রাজধানীতে মাথাপিছু আয়ও ৫ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি।

প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজারের পাশাপাশি ঢাকায় মানুষের আয় বাড়তে থাকায় রাজধানী ক্রমেই আকর্ষণীয় ভোক্তা বাজারে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

কাতাওকা বলেন, ঢাকায় উন্নত মানের ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। এটি মানসম্মত পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।

স্থানীয় উৎপাদনে জাপানি কোম্পানির আগ্রহ

বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্কহারের কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন কাতাওকা। এ কারণে কিছু জাপানি কোম্পানি শুধু পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশের পরিবর্তে স্থানীয় উৎপাদন ও স্থানীয়ভাবে পণ্য সংগ্রহের সমন্বিত কৌশল বিবেচনা করছে।

দেশীয় চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য খাতে জাপানি কোম্পানিগুলোর সুযোগ আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

কাতাওকার মতে, বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা এবং স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা আগামী বছরগুলোতে জাপানি বিনিয়োগের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে বিনিয়োগকারীদের এই বাড়তি আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে ব্যবসায়িক পরিবেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আবারও উল্লেখ করেন তিনি।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!