অর্থনীতি

নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটালের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি: বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট: অক্টো ২১, ২০২৬ : ০৫:৩৮ এএম ৮ ০
নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটালের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি: বাংলাদেশ ব্যাংক

নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি।

২০২৩ সালে দেশে নগদ লেনদেনের পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কমপারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নগদ লেনদেনের ব্যয় ছিল দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে এ ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ।

মাথাপিছু হিসাবে বছরে নগদ লেনদেনের ব্যয় ৯ হাজার ৯৩৮ টাকা। অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেনে এ ব্যয় মাত্র ৩৪৮ টাকা। অর্থাৎ নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—উভয় পর্যায়েই ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে।

নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ব্যয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বাসসকে বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ব্যয় জড়িত। ব্যাংক নোট ছাপানোর কাঁচামাল আমদানি, নোট ছাপানো, পরিবহন এবং বাজারে নোটের প্রচলন বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়।

তিনি বলেন, নিয়মিত ব্যবহারের কারণে ব্যাংক নোট পুরোনো, ক্ষতিগ্রস্ত ও ছেঁড়া হয়ে যায়। সেগুলোর পরিবর্তে নতুন নোট ছাপাতে হয়। ফলে অর্থনীতিতে এ-সংক্রান্ত ব্যয় বারবার তৈরি হয়।

ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে এসব ব্যয় কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় দুর্নীতি, চুরি ও অর্থের অপব্যবহার কমাতেও এটি সহায়তা করতে পারে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, নগদ লেনদেনের কারণে ব্যাংকগুলোকে বছরে প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোক্তাদের এ-সংক্রান্ত বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ ব্যবস্থাপনা ব্যয় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

নগদ লেনদেনের ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে মুদ্রা ছাপানো ও বিতরণ, অর্থ পরিবহন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ পরিচালনা এবং টাকা তোলা, বহন ও ব্যবহারে মানুষের ব্যয় করা সময়ের মূল্য।

ছায়া অর্থনীতিতে রাজস্ব হারায় সরকার

নগদ লেনদেনের সঙ্গে ছায়া অর্থনীতির সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়। এতে বলা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে বছরে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং নগদ লেনদেনের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ছায়া অর্থনীতির কারণে রাজস্ব হারানোর বিষয়টি হিসাবের বাইরে রাখলেও নগদ লেনদেনের ব্যয় ডিজিটাল লেনদেনের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।

ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের ইলেকট্রনিক রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে। এতে আর্থিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অর্থের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ সহজ হতে পারে। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল লেনদেনেও ঘাটতি

নগদ লেনদেনের তুলনায় ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় কম হলেও এ ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় বছরে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আয় হয়। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।

গবেষণায় ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারে কয়েকটি বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া বেশি মাশুল, লেনদেনের অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যে আন্তসংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং অনির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ।

এ ছাড়া প্রতারণা, লেনদেন ব্যর্থ হওয়া, ভুল হিসাবে টাকা চলে যাওয়া এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমিত দক্ষতার কারণে অনেক গ্রাহক ও ব্যবসায়ী ইলেকট্রনিক লেনদেনে আগ্রহী হচ্ছেন না।

গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ইলেকট্রনিক অর্থ স্থানান্তরের প্রসার ঘটলেও দেশের মোট লেনদেনের সংখ্যার ৮০ শতাংশের বেশি এখনো নগদে সম্পন্ন হয়।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য খরচ বড় বাধা

গবেষণায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যয়ের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবসায়ীর মুনাফার পরিমাণ সাধারণত কম। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের অতিরিক্ত মাশুল তাঁদের মুনাফা আরও কমিয়ে দিতে পারে।

এ জন্য লেনদেনের পদ্ধতি, অর্থ নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগবে এবং কী পরিমাণ খরচ হবে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্ট তথ্য থাকা জরুরি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেন ভোক্তাদের সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা দেয়। তবে এ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে নির্ভরযোগ্য সেবা, সহজে অভিযোগ জানানোর সুযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণাটি তৈরি করতে ডেস্কভিত্তিক গবেষণা, পেমেন্ট ব্যবস্থার তথ্য ও নীতিমালা পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ২১টি সাক্ষাৎকার এবং পাঁচটি দলভিত্তিক আলোচনা পরিচালনা করা হয়েছে।

বাংলা কিউআরে মাশুল শূন্য করার উদ্যোগ

ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তসংযোগযোগ্য লেনদেন উৎসাহিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালু করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের কাছে এ ব্যবস্থাকে আরও আকর্ষণীয় করতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ উদ্যোগের লক্ষ্য কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল লেনদেনের পথে বাধা কমানো। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে ব্যবস্থাটি ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের কাছে কতটা সাশ্রয়ী, সুবিধাজনক ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে তার ওপর।

গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুললেই ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার ঘটবে না। সাশ্রয়ী সেবা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সহজে ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

নগদনির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রাহক সুরক্ষা জোরদার, বিভিন্ন পেমেন্ট ব্যবস্থার আন্তসংযোগ বৃদ্ধি, অর্থ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব কমানো এবং ডিজিটাল লেনদেন বিষয়ে মানুষের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে গবেষণাটি।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় কম হওয়ায় এ ব্যবস্থার প্রসার দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে আয় ও ব্যবসার ধরন নির্বিশেষে সবার জন্য ডিজিটাল লেনদেন সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য করা জরুরি।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!