অর্থনীতি

‘দুই কেজি ফল নিলে এক হাজার টাকা নাই, মানুষ কেমনে কিনবে?’

আপডেট: অক্টো ২৩, ২০২৬ : ০৫:৫৪ এএম ২ ০
‘দুই কেজি ফল নিলে এক হাজার টাকা নাই, মানুষ কেমনে কিনবে?’

পরিবার নিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন আব্দুল বাতেন। সঙ্গে নিয়েছেন মিষ্টিসহ আরও কিছু খাবার। ভাবলেন, ফলও নেওয়া দরকার। ঢাকার দক্ষিণ মুগদার একটি ফলের দোকানে গিয়ে দাম জানতে চাইলেন। কিন্তু ফলের দাম শুনে আর কেনা হলো না। খালি হাতেই দোকান থেকে ফিরে গেলেন তিনি।

বাতেন বলেন, ‘যে ফলেই হাত দেই, কয় ৪০০ টাকা। দুই কেজি ফল নিলে এক হাজার টাকা নাই। মানুষ কেমনে কিনবে কন। ফল না নিয়া গেলে কিছু হবে না।’

শুধু বাতেন নন, ফলের চড়া দামে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। নিজেদের খাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির পথ্য কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য ফল কিনতে গেলেও এখন বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে আপেল, কমলা, মাল্টা, ডালিম ও আঙুরের মতো আমদানি করা ফলের দাম অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি ডালিম ও বেদানা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায়। কমলার দাম ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, আপেল ৩৮০ থেকে ৫২০ টাকা, আঙুর ৪৮০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং মাল্টা ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা। এ ছাড়া প্রতি কেজি নাশপাতি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, তরমুজ ৭০ থেকে ১০০ টাকা এবং ড্রাগন ফল ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

প্রতি ফলের দামও অনেক

কেজিপ্রতি দামের হিসাব করলে একটি ফল কিনতেও ক্রেতাকে উল্লেখযোগ্য টাকা খরচ করতে হচ্ছে। বাজারে চারটি বেদানায় এক কেজি হলে প্রতিটির দাম পড়ে প্রায় ১১৩ থেকে ১৩৮ টাকা। পাঁচটি মাল্টায় এক কেজি হলে প্রতিটির দাম ৭৬ থেকে ৮০ টাকা।

এক কেজিতে প্রায় নয়টি সবুজ আপেল থাকলে প্রতিটির দাম পড়ে ৪৪ থেকে ৫০ টাকা। লাল আপেল আট থেকে নয়টিতে এক কেজি হওয়ায় প্রতিটির দাম দাঁড়ায় প্রায় ৪২ থেকে ৬৫ টাকা। সাত থেকে আটটি কমলায় এক কেজি হলে প্রতিটির দাম পড়ে ৫৩ থেকে ৬৪ টাকা। আর এক কেজি নাশপাতিতে তিন থেকে চারটি থাকলে প্রতিটির দাম হয় ৭৫ থেকে ১১৩ টাকা।

আমদানি করা ফলের পাশাপাশি দেশি ফলের দামও কম নয়। মানভেদে প্রতি কেজি পাকা পেঁপে ৫০ থেকে ১২০ টাকা, পেয়ারা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আমড়া ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং সবুজ মাল্টা ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ডজন কলার দাম ৮০ থেকে ১৫০ টাকা এবং প্রতিটি জাম্বুরা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকায়।

খেজুরের দামও প্রকারভেদে কেজিতে ২৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। বাংলা খেজুর ২৫০ টাকা এবং মেডজুল খেজুর ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ডেঙ্গুর সময় ফলের দাম নিয়ে ক্ষোভ

জ্বর ও ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে ফলের বাড়তি দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। তাঁদের মতে, চিকিৎসকেরা ভিটামিন ‘সি’সমৃদ্ধ ফল খাওয়ার পরামর্শ দিলেও দাম বেশি হওয়ায় অনেকের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

ক্রেতা বাবুল মিয়া বলেন, ‘চারদিকে জ্বর, ডেঙ্গু। ডাক্তার ভিটামিন “সি” পাওয়া যায় এমন ফল খেতে দেয়। ফলের মধ্যে কমলা, মাল্টায় ভিটামিন “সি” আছে। কিন্তু দাম তো সাধারণ মানুষের নাগালে নেই।’

দাম বাড়ার কারণ কী বলছেন বিক্রেতারা

ফলের দাম বাড়ার পেছনে চাহিদা বৃদ্ধি, আমদানির শুল্ক এবং পরিবহনের সময় নষ্ট হয়ে যাওয়া ফলের প্রভাবের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।

ফল বিক্রেতা আব্দুর সাত্তার বলেন, ফলের চাহিদা বাড়ছে, দামও বাড়ছে। ভ্যাটও বেশি দিতে হয়। তাঁর দাবি, এক কেজি ফলে ১২০ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। ক্রেতারা মনে করেন, দাম বাড়লে বিক্রেতাদের লাভও বাড়ে। কিন্তু তাঁর ভাষ্য, ১০ বছর আগে ফল বিক্রি করে কেজিতে যে লাভ হতো, এখনো প্রায় একই রকম লাভ হয়; শুধু পণ্যের দাম বেড়েছে।

আরেক বিক্রেতা ইদ্রিস মিয়া বলেন, ডেঙ্গুর কারণে মাল্টাসহ কিছু ফলের চাহিদা বেড়েছে। তাঁরা রাজধানীর বাদামতলী থেকে ফল আনেন। অনেক সময় ক্যারেটে বেশ কিছু ফল নষ্ট পাওয়া যায়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কিছুটা বেশি দামে ফল বিক্রি করতে হয় বলে জানান তিনি।

শুল্ক কমানোর উদ্যোগের কথা জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী

সম্প্রতি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ফলের দাম নিয়ে কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, শুল্ক পরিশোধের পরও প্রতি কেজি মাল্টা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

মন্ত্রী আরও বলেন, ডলারের বাজারের ওপর ভিত্তি করে ফলের শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলের প্রকৃত শুল্কহার ১২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে কাজ চলছে।

জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে মানুষকে বেশি বেশি ফল কেনায় উৎসাহিত করতে চায় সরকার বলেও জানান তিনি। তবে শুল্ক কমানোর উদ্যোগের সুফল বাজারে কবে নাগাদ পাওয়া যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে ফলের চড়া দামে সাধারণ ক্রেতাদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!