অর্থনীতি

ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি: মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

আপডেট: অক্টো ২৪, ২০২৬ : ০৬:০৭ এএম ১ ০
ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি: মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে পোশাক আমদানিতে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস মিলছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি–আগস্ট) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমলেও, বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে ক্রয়াদেশ ও আমদানিতে গতি ফিরতে শুরু করেছে।

তবে এই ইতিবাচক প্রবণতার মধ্যেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখনো চাপে রয়েছে।

ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য ছিল ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরো। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম। আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এ সময় প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্যও ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৬৫ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।

তবে বছরের শুরুতে আমদানিতে যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমেছে। বিএভির হিসাব অনুযায়ী, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ

ইউরোপের বাজারে পোশাক আমদানির গতি বাড়তে শুরু করলেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছিল ১৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আগস্ট পর্যন্ত বছরওয়ারি হিসাবে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

২০২৬ সালের জানুয়ারি–আগস্ট সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য ছিল ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৭ কোটি ইউরো।

এ সময় বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজি। পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমার পেছনে শুধু রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস নয়, বরং পোশাকের গড় একক মূল্য কমে যাওয়াও বড় কারণ। আগের তুলনায় কম দামে পোশাক রপ্তানি করায় মোট আয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা ২১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

বছরের শুরুতে আমদানি কমার কারণ

২০২৫ সালে ইইউর পোশাক আমদানি ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছেছিল। একই বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের মুখে চীন ইউরোপের বাজারে বেশি পোশাক রপ্তানি করে। ২০২৫ সালে ইইউতে চীনের পোশাক রপ্তানি বেড়েছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

এর ফলে ২০২৬ সালের শুরুতে ইউরোপের খুচরা বিক্রেতাদের হাতে আগের বছরের তুলনায় বেশি পণ্যের মজুত ছিল। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ইউরোপীয় অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করে। চলতি বছর ইইউতে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। একই সময়ে ভোক্তাদের আস্থা ৪০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবিক্রীত পোশাকের মজুতের কারণে খুচরা বিক্রেতারা নতুন পণ্যের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেন। এর প্রভাব পড়ে জানুয়ারির আমদানিতে। ওই মাসে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে যায়।

মাঝামাঝি সময়ে ফিরেছে ক্রয়াদেশ

বছরের শুরুর দিকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেওয়ার পর ইউরোপের খুচরা বিক্রেতারা ধীরে ধীরে মজুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। জুন থেকে আগস্ট সময়ে শরৎ ও শীত মৌসুমের পোশাক ইউরোপে পৌঁছানোও আমদানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি বসন্তে খুচরা বিক্রি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

গত মে মাসে ইইউর খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল। বছরের শুরুতে পিছিয়ে পড়া কিছু চালান পরবর্তী সময়ে ইউরোপে পৌঁছানোয় আমদানির পরিসংখ্যানেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।

ইউরোপের বাজারে চীনের হিস্যা বাড়ছে

ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। জানুয়ারি–আগস্ট সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের পোশাক রপ্তানির মূল্য ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরো হয়েছে। ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে দেশটির হিস্যা ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এ সময় দেশটির রপ্তানি আয় ছিল ৩০০ কোটি ইউরো। প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্যও বেড়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ।

অন্যদিকে পাকিস্তান রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়াতে পারলেও প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমিয়েছে। দেশটির প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ১০ দশমিক ৮৮ ইউরো, যা প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

এ ছাড়া তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার ইইউতে পোশাক রপ্তানির মূল্য প্রায় ১১ শতাংশ করে কমেছে। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশের অবস্থান এক রকম নয়। চীন বাজারের হিস্যা বাড়াচ্ছে, ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক রপ্তানি করছে। বিপরীতে বাংলাদেশকে রপ্তানি আয় ও বাজার হিস্যা—দুই ক্ষেত্রেই চাপ সামলাতে হচ্ছে।

২০২৭ সালে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, রয়েছে ঝুঁকিও

ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইইউর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করা হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে ২ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে।

তবে এই পূর্বাভাস বাস্তবায়নে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চলতি বছর ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে আনুমানিক শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দিয়েছে। তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। ফলে জ্বালানি, পরিবহন ও বিমা ব্যয় উঁচু পর্যায়ে থাকলে ২০২৭ সালে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ইউরোপের ভোক্তা ব্যয় ও খুচরা বিক্রিও পোশাক আমদানির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বছরের শেষভাগে বড়দিনকেন্দ্রিক কেনাকাটা প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হলে ইউরোপীয় ক্রেতারা ২০২৭ সালের শুরুতে নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে পারেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

নতুন বাণিজ্যনীতিতে বাড়তে পারে প্রতিযোগিতা

২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) বিধিমালা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে ভারত–ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ দুই নীতিগত পরিবর্তন ইউরোপের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ভারত–ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি জিএসপি বিধিমালার পরিবর্তন বাংলাদেশের বাজারসুবিধার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে পোশাকের মূল্য প্রতিযোগিতা, পণ্যের গুণগত মান এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি হবে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের তথ্য ইউরোপের পোশাক বাজারে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও বাজার হিস্যা কমে যাওয়া উদ্বেগের কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, জ্বালানির উচ্চমূল্য, বড়দিনের কেনাকাটা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ২০২৭ সালের সম্ভাব্য বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন। ফলে ইউরোপের বাজারে মন্দা কাটিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নির্ভর করবে চাহিদা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!