আন্তর্জাতিক

সুইজারল্যান্ডে ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, হরমুজ নিয়ে নতুন উত্তেজনা

আপডেট: জুন ২১, ২০২৬ : ০৪:৪৭ এএম
সুইজারল্যান্ডে ফের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, হরমুজ নিয়ে নতুন উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে নতুন করে আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। রোববার সুইজারল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া বৈঠকে অংশ নিতে ইতিমধ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে পৌঁছেছেন। তবে আলোচনার আগেই হরমুজ প্রণালী এবং লেবানন পরিস্থিতি ঘিরে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের প্রতিনিধিদলও বৈঠকস্থলে এসে পৌঁছে। ইরানি প্রতিনিধিদলে দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রয়েছেন।

সুইজারল্যান্ডগামী বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন যুদ্ধবিরতি—এই দুই বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে আমরা আশা করছি। আলোচনায় মূলত এসব বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

এর আগে শুক্রবার একই ধরনের একটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। লেবাননে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়া এবং কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন সংকট

এদিকে ইরান জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে তারা আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘দক্ষিণ লেবাননে জায়নবাদী বাহিনীর ধারাবাহিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে হরমুজ প্রণালী নৌচলাচলের জন্য বন্ধ রাখা হবে।’

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী। এর মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে ইরানের এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত রাখতে তাদের বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ব্যবস্থা নিতে পারে।

সুইজারল্যান্ডে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক

সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে রোববার কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরাও অংশ নেবেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রাথমিক চুক্তির যেসব বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার ভিত্তি তৈরিই হবে এ বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেছেন, ‘চুক্তির আওতায় অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অন্যথায় পুরো সমঝোতাই ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের এক সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়েছে।

হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হাসান ফদলাল্লাহ বলেছেন, ‘শত্রুপক্ষ হামলা চালালে আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের রয়েছে।’ তবে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি প্রথমে ভঙ্গ করেছে হিজবুল্লাহ।

দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা ফাদি জায়াত বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন আগে বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু আবার পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি। এলাকায় এখনো ভয় আর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, সুইজারল্যান্ডের এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে লেবাননের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী নিয়ে নতুন উত্তেজনা আলোচনার অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!