প্রাণনাশের হুমকির আশঙ্কায় তুরস্কে অবস্থানের সময় গোপনে বিমান বদল করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশের পর মঙ্গলবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প নিজেই।
তবে তাঁর এ বিমান বদল ঘিরে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৮ জুলাই তুরস্কে অবস্থানের সময় এয়ার ফোর্স ওয়ান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেওয়ার আগে ট্রাম্পকে গোপন অভিযানে বিমান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। খাবার সরবরাহের একটি কার্গো কনটেইনারের আড়ালে তাঁকে অন্য একটি বিমানে নেওয়া হয়। এ সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিক ও শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতে পারেননি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, নিরাপত্তার কারণে তাঁকে অন্য একটি বিমানে যেতে বলা হয়েছিল। নিরাপত্তাব্যবস্থা একই ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হয় কোনো হুমকি ছিল। বিষয়টি নিয়ে আমি খুব বেশি কিছু জানতে চাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো প্রেসিডেন্টেরই অনেক হুমকি থাকে।’ তবে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি এসব নিয়ে চিন্তা করেন না।
সাংবাদিকদের না জানিয়ে বিমান বদল
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে বেরিয়ে একটি কার্গো কনটেইনারের ভেতরে ওঠেন। পরে সেখান থেকে কাছেই থাকা মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি ছোট বিমানে করে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা প্রায় এক ডজন সাংবাদিককে বিমান বদলের বিষয়টি জানানো হয়নি। তাঁরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকার সুযোগ না পেলেও ওই বিমানেই তুরস্ক ত্যাগ করেন।
বিষয়টি জানার পর কয়েকজন সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, অজান্তেই তাঁদের ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক লক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগও তোলেন।
ইরানের হামলার আশঙ্কা ছিল?
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এয়ার ফোর্স ওয়ানকে কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল ইসরাইল। ওই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও বিমানটিতে ছিলেন।
বিমানটিতে থাকা সাংবাদিকদের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নের সময় জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল সিক্রেট সার্ভিস। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে এমন নির্দেশকে অস্বাভাবিক বলে মনে করেছেন সাংবাদিকেরা।
এ ঘটনায় সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার মঙ্গলবার কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকি এবং তাঁকে তুরস্ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো ‘অসাধারণ পদক্ষেপ’ সম্পর্কে অবহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কাতারের দেওয়া বিমান নিয়েও প্রশ্ন
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্প কাতারের উপহার দেওয়া বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭ বিমানে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর সফর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিমানটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনের উপযোগী করে সংস্কার করা হলেও এতে এয়ার ফোর্স ওয়ানের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না বলে জানা যায়।
এ কারণে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, কাতারের দেওয়া বিমানটি ব্রিটেনে মার্কিন সেনাদের দেখানোর জন্য আগেই পাঠানো হয়েছিল এবং এটি সেনাদের জন্য বিশেষ উপহার।
ব্রিটেনে যাত্রাবিরতির পর ওয়াশিংটনে ফেরার সময় অবশ্য ট্রাম্প আবার কাতারের দেওয়া বিমানেই ওঠেন। সে সময় সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হলে এর কারণ জানতে চান তাঁরা। ট্রাম্প তখন সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন।’
আগেও প্রেসিডেন্টের বিমান বদলের নজির
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিরাপত্তার স্বার্থে শেষ মুহূর্তে বিমান পরিবর্তনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০০০ সালে ভারত থেকে পাকিস্তান যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিমান পরিবর্তন করা হয়েছিল। সে সময় সিক্রেট সার্ভিস সদস্যদের বহনকারী একটি ডিকয় বিমানও ব্যবহার করা হয়।
২০২৩ সালে ইউক্রেন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের যাত্রাপথও ছিল কঠোর গোপনীয়তায় মোড়া। দীর্ঘ বিমান ও ট্রেনযাত্রার ওই সফরে অবশ্য একজন প্রতিবেদক ও একজন আলোকচিত্রী তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের না জানিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে থাকা সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের কতটা ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়েছিল।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!