চীন, রাশিয়া ও ভারতসহ ব্রিকস নেতারা জোটের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। রোববার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে নেতাদের বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ব্রিকস বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ, বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ২৫ শতাংশের বেশি প্রতিনিধিত্ব করে।
নয়াদিল্লি থেকে এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকের শেষ দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অন্য নেতাদের উদ্দেশে মোদি বলেন, ‘ব্রিকসের শক্তি নিহিত রয়েছে আমাদের বৈচিত্র্য ও সহযোগিতার মধ্যে।’
মোদি আরও বলেন, ‘আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।’ ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে উঠলেও সহযোগিতার মাধ্যমে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান
সম্মেলনের প্রথম দিন শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পায়। বিরল এক সমঝোতায় ব্রিকস নেতারা মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমাতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মধ্যপ্রাচ্য/পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনার ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতিতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ ব্রিকসের দেশগুলো সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়।
বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও অংশ নেন। এর আগে ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধ নিয়ে মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল।
তবে আয়োজক ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতার পর এবার নেতারা যৌথ বিবৃতি প্রকাশে একমত হন।
সি চিন পিংয়ের ভারত সফর
ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০১৯ সালের পর এটাই প্রতিবেশী ভারতে তাঁর প্রথম সফর। দুই দেশের মধ্যে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের ছয় বছর পর সি’র এই সফর ভারত-চীন সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে ধীরে ধীরে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। পুনরায় বিমান চলাচল, ভিসা চালু এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে।
নয়াদিল্লির প্রকাশ করা এক ভিডিওতে মোদির সঙ্গে বৈঠকে সি বলেন, ‘আমাদের দুই দেশ অনেক দিক থেকে ভিন্ন হলেও পরস্পরের শক্তির পরিপূরক হওয়া, পরস্পরকে সহযোগিতা করা, পারস্পরিক সাফল্য অর্জন ও একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে।’
সি আরও বলেন, উভয় পক্ষের উচিত বৃহৎ আর্থিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া, সমতাভিত্তিক ও টেকসই বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা এবং উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে এগিয়ে নেওয়া।
তবে ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এখনো মীমাংসিত হয়নি। প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে দুই দেশই বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন রেখেছে।
বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই নেতা সীমান্ত প্রশ্নের একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে।
ব্রিকসের গুরুত্ব
২০০৯ সালে ব্রিকস গঠিত হয়। পশ্চিমা প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই জোটের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সংঘাত, বাণিজ্যে অস্থিরতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক বিষয়েও জোটটি ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
এদিকে ভারতে সি চিন পিংয়ের সফরের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিতে কয়েক ডজন তিব্বতি বিক্ষোভ করেন। ১৯৫৯ সালে চীনের দমন-পীড়নের পর তিব্বতিদের একটি বড় অংশ ভারতে আশ্রয় নেয়। তাঁদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা দালাই লামাও রয়েছেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!