মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়ায় জ্বালানি সাশ্রয়ে কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা আবারও কার্যকর করেছে পাকিস্তান সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশটির দোকান, বাজার ও শপিংমলসহ অধিকাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ আগামী তিন মাসের জন্য ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘ডন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্তগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দোকান, বাজার, শপিংমল, হাটবাজার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, মুদি দোকান ও কিরানা দোকান রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। বিয়ের হল, মার্কি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে রাত ১০টার মধ্যে। রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও খাবারের দোকান রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
তবে খাবার প্যাকেট করে নিয়ে যাওয়া এবং বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সেবার ক্ষেত্রে এসব সময়সীমা প্রযোজ্য হবে না।
কিছু প্রতিষ্ঠানকে এই নির্দেশনার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফার্মেসি, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দোকান, চিকিৎসা পরীক্ষাগার, ক্লিনিক, হাসপাতাল, স্বতন্ত্র বেকারি ও তন্দুর, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দোকান, পেট্রল ও সিএনজি স্টেশন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন। জিম, ক্রীড়া স্থাপনা, প্যাডেল কোর্ট, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ও কল সেন্টারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বন্ধের সময় রাখা হয়নি।
বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়েও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিয়ের যেকোনো আয়োজনে শুধু একটি পদ পরিবেশন করা যাবে।
সরকারি খাতেও কৃচ্ছ্রসাধন
সরকারি গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত আগামী তিন মাস কার্যকর থাকবে। তবে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও জরুরি সেবায় ব্যবহৃত গাড়ি এ সিদ্ধান্তের বাইরে থাকবে। রাজস্ব বোর্ডের ব্যবহৃত গাড়িও ছাড় পাবে। তবে এসব সংস্থার প্রশাসনিক ও অ-অপারেশনাল শাখার গাড়ি এ সুবিধা পাবে না।
উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও জ্বালানি কমানোর সিদ্ধান্তের আওতামুক্ত থাকবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়—এমন সরকারি খাতের বাজেট ৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদেশি মিশন ও সেখানে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে। তবে বাড়িভাড়া, শিক্ষার ফি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয় এর বাইরে থাকবে।
সরকারি অর্থে সব ধরনের গাড়ি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত সরঞ্জাম ও সেবা ছাড়া অন্যান্য টেকসই পণ্য কেনাও বন্ধ থাকবে। উন্নয়ন প্রকল্প এ ক্ষেত্রে ছাড় পাবে।
বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা
সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ সফরের ওপর আগামী তিন মাস নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক সরকারি সফরও সাধারণভাবে এর আওতায় থাকবে।
তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বৃত্তি, অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগের মাধ্যমে আয়োজিত প্রশিক্ষণ ও কোর্স এবং পাকিস্তান সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় আয়োজিত প্রশিক্ষণ এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
জরুরি সফর এড়ানো সম্ভব না হলে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, সংসদীয় কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের শুধু অর্থনৈতিক শ্রেণিতে ভ্রমণ করতে হবে।
সরকারি বৈঠকের ক্ষেত্রেও ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক আয়োজন করতে বলা হয়েছে। বিদেশি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফরে এলে ছাড়া সরকারি অর্থে কোনো নৈশভোজ আয়োজন করা যাবে না।
সরকারের অর্থায়নে আয়োজিত সরকারি সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও সম্মেলনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন জরুরি হলে বেসরকারি ভেন্যুর পরিবর্তে সরকারি স্থাপনা ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থার কোনোটি থেকে ছাড় চেয়ে আবেদন করা হলে তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা হতে পারে। জ্বালানি সাশ্রয় ও কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে গঠিত কমিটি এসব আবেদন পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় আগের জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচির আওতায় নেওয়া ব্যবস্থা আবার চালুর কথা ভাবছে সরকার।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় গত ৯ মার্চ কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। তখন সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো, আইনপ্রণেতাদের বেতন কমানো এবং সরকারি খাতে আংশিকভাবে বাড়ি থেকে কাজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে ১৯ জুন এসব ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়। তবে বাজার ও দোকান বন্ধের নির্ধারিত সময় বহাল ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পথ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহে চাপের পাশাপাশি তেলের দামও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কমাতে নতুন করে কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে পাকিস্তান সরকার।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!