নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় গোরখা জেলায় আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, দোকান ও গবাদিপশু হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন অনেক মানুষ। কয়েক মিনিটের প্রবল পানির স্রোতে তছনছ হয়ে গেছে তাঁদের সাজানো জীবন। এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অবশিষ্ট কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁরা।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অজয় গুরুংয়ের বাড়ির পাশে এখনো জমে আছে ঘন কাদা। সেই কাদার মধ্যে অর্ধেক চাপা পড়ে আছে তাঁর ঘর। একসময় যে বুড়ি গণ্ডকী নদী তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা করত, সেই নদীর পানির স্রোতই রোববার তাঁর সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এ বন্যায় গোরখা জেলায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ও পাঁচটি সেতু ভেসে গেছে। এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। তবে অন্তত ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।
৩৩ বছর বয়সী অজয় গুরুং এএফপিকে বলেন, নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে ওঠায় তাঁর দোকান ও গবাদিপশু ভেসে গেছে। নিজের চোখের সামনেই সব হারাতে দেখেছেন তিনি।
গুরুং বলেন, ‘এখন সবকিছু শেষ। বসবাসের জন্য এখন আমাকে বিকল্প কোনো জায়গা খুঁজতে হবে।’
প্রায় দুই দশক ধরে ট্রেকিং গাইড হিসেবে কাজ করছেন গুরুং। মানাসলু সার্কিট এলাকায় পর্যটকদের নিয়ে বহুবার গেছেন তিনি। কিন্তু সেখানে এবার যে পরিমাণ ভূমিধস দেখেছেন, তা আগে কখনো দেখেননি বলে জানান তিনি।
গুরুংয়ের আশঙ্কা, তুষারাবৃত পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর তীরে গড়ে ওঠা জনবসতিগুলো ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বন্যায় নিঃস্ব অনেক পরিবার
বুড়ি গণ্ডকী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। কাদার মধ্যে ধ্বংসস্তূপ তন্নতন্ন করে খুঁজছেন বাসিন্দারা। তাঁদের আশা, ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে হয়তো কিছু উদ্ধার করা যাবে।
বন্যায় নিজের কলার বাগান হারিয়েছেন লাল কুমারী থাপা। তিনি বলেন, ‘আমার একটি কলার বাগান ছিল। সেটিও আর নেই। এখন আমাদের শুধু একটি ছোট কুঁড়েঘর অবশিষ্ট আছে। সেটি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে।’
থাপা জানান, অন্য অনেক পরিবারের ক্ষতি আরও বেশি হয়েছে। কারও ঘরের চালের সামান্য অংশও অবশিষ্ট নেই। বুড়ি গণ্ডকীর পানি ঘরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। এমনকি অনেকের পরার মতো কাপড়ও নেই।
নেপালে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সর্বশেষ এ বন্যা পাহাড়ি এলাকার মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বারবার দুর্যোগ, বাড়ছে ঝুঁকি
দুর্গম ও বন্ধুর ভূপ্রকৃতির কারণে নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে।
গত আগস্টে দেশটির উত্তরের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে ওই দুর্যোগে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর এবং পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বুড়ি গণ্ডকীর বন্যার দুই মাসেরও কম সময় আগে রাসুয়া জেলায় বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের পর প্রবল পানির ঢল ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। বিজ্ঞানীদের মতে, ওই দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।
এ ছাড়া গত মাসে ভারী মৌসুমি বৃষ্টিতে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারের তাগিদ
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, সর্বশেষ বন্যাটিও পাথর ও বরফের ধসের কারণে ঘটেছে।
কর্তৃপক্ষের প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি বলেন, এ বছর একের পর এক দুর্যোগ ঘটেছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্যোগের ঘনঘন পুনরাবৃত্তি থেকে বোঝা যায়, পাহাড়ি এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে পাহাড়ি এলাকার পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে বিপদ এখন আর দূরের কোনো আশঙ্কা নয়। দিল কুমারী থাপা মাগার কয়েক সপ্তাহ আগেও মুঠোফোনে রাসুয়া জেলার ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য দেখেছিলেন। এলাকাটি দূরে হওয়ায় তখন উদ্বিগ্ন হলেও ভাবেননি, একই বিপর্যয় একদিন তাঁর নিজের বাড়িতেও আঘাত হানবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা রাসুয়ার বন্যার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। জায়গাটি বেশ দূরে ছিল। কিন্তু বন্যার দৃশ্য দেখে আমরা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।’
এরপর কিছুটা থেমে তিনি বলেন, ‘এখন আমরাই বন্যার শিকার হয়েছি।’
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!