শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ফ্রান্সে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের বিক্ষোভ এক মাস পরও থামেনি। রাজধানী প্যারিসে গত এক মাসে আন্দোলনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১ হাজার ২৬০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশই নাবালক। ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। অপর্যাপ্ত শিক্ষক, দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল খোলা রাখা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত সংখ্যা নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। পরে তা রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে জানিয়েছেন, দেশজুড়ে প্রায় ২০০টি উচ্চবিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। এদিকে আন্দোলনকারীরা আগামী শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেছেন, বিক্ষোভ এখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ‘শহুরে সহিংসতার আন্দোলনে’ রূপ নিয়েছে। প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার মতো আহ্বানেরও নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
লেকর্নু জানান, স্কুল ভবনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আঞ্চলিক পরিষদগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে সরকার।
ভর্তি প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে সরকার
শিক্ষামন্ত্রী জেফ্রে জানিয়েছেন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সরকারি প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসুপ’-এর মাধ্যমে পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গ্রাদিগনান এলাকার একটি উচ্চবিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কাজ চলছে।
জেফ্রে আরও জানান, সরকার ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গ্রাদিগনান এলাকায় সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত উচ্চবিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৪ থেকে কমে ৪৭টিতে নেমেছে।
শরতের ছুটির পর স্কুলগুলোতে আবার ক্লাস শুরু হলে কোনো উচ্চবিদ্যালয়ই যেন ‘রেড জোন’ বা ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় না থাকে, সে আশাবাদও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
আহত ২৮৬ পুলিশ সদস্য
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে মহানগর এলাকায় ১ হাজার ২৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের ৮৬ শতাংশই নাবালক। ফ্রান্সে এর আগে কোনো আন্দোলনে এত বেশি মানুষ গ্রেপ্তারের নজির নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের হালনাগাদ তথ্যমতে, প্রায় এক মাস ধরে চলা বিক্ষোভে ২৮৬ জন পুলিশ ও জেন্ডার্ম এবং শিক্ষা বিভাগের ১৩ জন কর্মী আহত হয়েছেন। এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, সহিংসতার ঘটনা বারবার ঘটছে এবং এর তীব্রতা বাড়ছে। গত ১৩ অক্টোবরের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ৭১ জন সদস্য আহত হন।
প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁ শহরের কয়েকটি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো অবরোধ কর্মসূচি চলছে। প্যারিসের পশ্চিমে জুই-এন-জোসা এলাকায় অবস্থিত ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এইচইসি প্যারিসেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলন শুরুর পর এই প্রথম প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভ করেন।
অন্যদিকে, আগের বিক্ষোভগুলোতে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে লিওঁর প্রশাসন বৃহস্পতিবার সকালে নির্ধারিত একটি ছাত্র বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে।
এর আগে ৮ অক্টোবরের এক বৈঠকে ‘লে লিসিয়েনস!’ ও ‘ইউনিয়ন সিন্ডিকাল লিসিয়েন’-এর মতো শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এ আন্দোলন এখন দেশজুড়ে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!