আন্তর্জাতিক

১০ বছরে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শিশু অভিবাসীর মৃত্যু: আইওএম

আপডেট: অক্টো ১৭, ২০২৬ : ০৫:০০ এএম ৪ ০
১০ বছরে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি শিশু অভিবাসীর মৃত্যু: আইওএম

উন্নত জীবন ও নিরাপত্তার আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে অভিবাসনের চেষ্টা করতে গিয়ে গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৪ হাজার ৪১৪ শিশু মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, নথিবদ্ধ হিসাবের বাইরেও বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বাসসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। আইওএমের নিখোঁজ অভিবাসী প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন অভিবাসন রুটে এসব শিশু মৃত্যুর বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, মরুভূমির চরম আবহাওয়া, পানিশূন্যতা, অনাহার এবং মানব পাচারকারীদের সহিংসতার কারণে প্রতি বছর বহু শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগের অভাব তাদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমধ্যসাগরীয় পথ

আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, শিশু অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক রুটগুলোর একটি ভূমধ্যসাগর। উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে ২ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত এবং আমেরিকা অঞ্চলে অভিবাসনের চেষ্টাকালে মরুভূমির কঠিন পরিবেশ ও নদীতে ডুবে অন্তত ৮৫০ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ছাড়া সাহারা মরুভূমি ও হর্ন অব আফ্রিকার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পানিশূন্যতা ও তীব্র গরমে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

মৃত ও নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ সাব-সাহারা আফ্রিকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা

আইওএম ও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের উদ্বেগ, উদ্ধার হওয়া মরদেহ কিংবা ডুবে যাওয়া নৌকার যাত্রীদের বড় একটি অংশের বয়স ও পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। ফলে নথিভুক্ত হিসাবের বাইরে আরও বহু শিশুর মৃত্যু আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক যুগে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮১ হাজার অভিবাসীর মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে আইওএম। তাঁদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৬২ জনের বয়সসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে নিখোঁজ বা মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন শিশু, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।

২০২৪ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়ে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছানো অভিবাসীদের ১৯ শতাংশ শিশু ছিল। অথচ ওই রুটে নথিবদ্ধ মোট মৃত্যুর মাত্র ২ শতাংশকে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আইওএমের মতে, এই ব্যবধান থেকে শিশু মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র নথিতে উঠে না আসার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিশু মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের মাত্র ১৮ শতাংশ পাওয়া যায় চিকিৎসা পরীক্ষক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতো সরকারি সূত্র থেকে। বাকি তথ্যের বড় অংশ আসে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা, গণমাধ্যম এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্য থেকে।

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরও মৃত্যু

যেসব শিশুর বয়স শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে শতাধিক শিশুর বয়স ছিল পাঁচ বছরের কম। নথিবদ্ধ মৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ ছিল ছেলে শিশু। তবে প্রায় ৫২ শতাংশ মরদেহের ক্ষেত্রে বয়স বা লিঙ্গ—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে নৌকাডুবি, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই অনিরাপদ নৌযান, মরুভূমির তীব্র তাপপ্রবাহ, পানিশূন্যতা, অনাহার এবং মানব পাচারকারীদের নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরাপদ অভিবাসনের পথ তৈরির আহ্বান

আইওএমের মহাপরিচালক বলেছেন, আইনি ও নিরাপদ অভিবাসনের পথের অভাব শিশুদের চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিটি শিশুর মৃত্যু বিশ্বনেতাদের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা।

আইওএমের ডেটা ও পলিসি বিভাগের প্রধান স্টুয়ার্ট ক্যাম্পো বলেন, অভিবাসনযাত্রায় প্রাণ হারানো প্রতিটি শিশুর হিসাব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু তথ্যের অভাবে অনেক শিশু এই তালিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিপদের প্রকৃত চিত্র জানা না গেলে শিশুদের যথাযথ সুরক্ষা দেওয়াও কঠিন।

আন্তর্জাতিক ডেটা অ্যালায়েন্স ফর চিলড্রেন অন দ্য মুভ (আইডিএসি) ও ইউনিসেফের সহায়তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে সীমান্তে মৃত ব্যক্তিদের বয়স ও অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, উদ্ধার তৎপরতা জোরদার এবং মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!