জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং তরুণদের উদ্বেগ নিরসনে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্যারিসে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। শনিবারের এই বিক্ষোভের শুরুতে পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষ পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণেরা পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তাঁরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী জেসিকা বলেছেন, প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে পদদলিত করা হচ্ছে বলে তাঁর মনে হচ্ছে।
শনিবার প্যারিসের বিক্ষোভে কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকদের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মূল মিছিলে অংশ নেন ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। অন্যদিকে শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটির হিসাবে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ
বৃষ্টির মধ্যে প্যারিসের একটি ট্রামস্টপের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদানে গ্যাসে আচ্ছন্ন রাস্তায় সংঘর্ষের দৃশ্য দেখছিলেন কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তাঁদের একজন ২৩ বছর বয়সী মাইক। তরুণদের উদ্বেগ নিরসনে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানাতে তিনি মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন।
পদবি প্রকাশে অনিচ্ছুক মাইক বলেন, ‘আমাদের মনে হয়, ফ্রান্সের বয়স্ক জনগোষ্ঠী আমাদের অবহেলা করছে।’
বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ পাল্টা ধাওয়া দেয় এবং লাঠিপেটা করে। পুলিশের এমন পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মাইক ও তাঁর বন্ধুরা।
মাইক প্রশ্ন করেন, ‘চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, এরা তো কিশোর-কিশোরী। কিশোরদের কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ও লাঠিপেটা করা কি স্বাভাবিক?’
২৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী জেসিকাও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, এত সহিংসতার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।
জেসিকা বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে পদদলিত করা হচ্ছে।’
শান্তিপূর্ণ মিছিলের পর সংঘর্ষ
শনিবার প্যারিসের পূর্বাঞ্চলের সড়ক ধরে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার সময় পরিবেশ ছিল অনেকটাই উৎসবমুখর। লাউডস্পিকারে বাজছিল ফরাসি পপসংগীত, আর বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন। বহুতল আবাসিক ভবনের জানালা থেকে বাসিন্দারাও তাঁদের উদ্দেশে উল্লাস প্রকাশ করেন। জবাবে বিক্ষোভকারীরা উচ্ছ্বাসে সাড়া দেন। কোথাও কোথাও রাস্তায় ছোট ছোট নাচের আসরও বসে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া লরেলেই ভ্যান ডার পুলের হাতে ছিল সাউথ পার্ক কার্টুনের কয়েকটি চরিত্রের ছবি সংবলিত একটি প্ল্যাকার্ড। এতে লেখা ছিল, ‘তোমরা আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছ, হারামজাদারা।’ কার্টুনটির একটি পরিচিত সংলাপের আদলে তৈরি প্ল্যাকার্ডটি দেখে অনেকে থেমে হাসেন এবং ছবি তোলেন।
তবে মিছিলের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সেখানে সারি সারি পুলিশ সদস্য ও পুলিশের ভ্যান অপেক্ষা করছিল। এএফপির এক সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পুলিশ বারবার বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় এবং কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই ছিলেন তরুণ।
শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করা ডেভিড নামের এক বিক্ষোভকারীকে তখন বিচলিত দেখাচ্ছিল। তাঁর মুখে ছিল কাটা দাগ। ডেভিডের দাবি, এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর দিকে লাঠি ছুড়ে মারলে তিনি আহত হন।
ডেভিড বলেন, ‘পুলিশ সবার দিকে এগিয়ে এসে নিচু হতে ও পেছনে সরে যেতে বলছিল। তারা মানুষকে ফেলে দিচ্ছিল, বিক্ষোভকারীদের মারধর করছিল।’
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ রাস্তাঘাট খালি করতে শুরু করে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
দেশজুড়ে ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন
এক সপ্তাহ আগে দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। নতুন করে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আন্দোলনটি শুরু হয়। প্রথমে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়। এতে আরও ব্যাপক মানুষের সমর্থন যুক্ত হয়।
‘প্রতি শনিবারই এখানে থাকব’
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় হতাশ হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জেসিকা। তাঁর মতে, অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জেসিকা বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, একটি জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সবাই লড়ছি।’
তাঁর বন্ধু ২৪ বছর বয়সী ব্রায়ানও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি শনিবার আসতে হলে আমরা প্রতি শনিবারই এখানে থাকব।’
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যেও আন্দোলনকারীদের এমন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও তরুণদের উদ্বেগের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাঁদের ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি। বরং নিজেদের দাবি আদায়ে নিয়মিত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!