মুখ ধোয়ার জন্য গরম পানি ব্যবহার করা উচিত কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা পরামর্শ দেখা যায়। অনেকের দাবি, গরম পানি দিয়ে মুখ ধুলে ত্বকে অকাল বার্ধক্যের ছাপ পড়ে এবং বলিরেখা তৈরি হয়। এ কারণে কেউ কেউ শুধু ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন। তবে এ ধারণার পেছনে কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরম পানি দিয়ে মুখ ধুলেই সরাসরি বলিরেখা তৈরি হয়, এমন নয়। তবে নিয়মিত অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করলে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, টানটান ভাব এবং জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে ত্বকের সূক্ষ্ম রেখাগুলোও তুলনামূলক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
গরম পানি ত্বকের কী ক্ষতি করে?
ত্বকের বাইরের স্তরে প্রাকৃতিক তেল ও লিপিড থাকে। এগুলো ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং বাইরের ক্ষতিকর উপাদান থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের এই প্রাকৃতিক তেলের কিছু অংশ সরিয়ে ফেলতে পারে।
এর ফলে ত্বক শুষ্ক, খসখসে ও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে লালচে ভাব ও জ্বালাপোড়াও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ত্বক আগে থেকেই শুষ্ক বা সংবেদনশীল, তাঁদের অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহারে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
গরম পানিতে কি সরাসরি বলিরেখা তৈরি হয়?
ত্বকে বয়সের ছাপ পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বয়স বৃদ্ধি, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং দীর্ঘদিন সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে থাকা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তাই গরম পানিকে অকাল বার্ধক্যের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
তবে অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে। শুষ্ক ও পানিশূন্য ত্বকে সূক্ষ্ম রেখাগুলো বেশি দৃশ্যমান হয়। অর্থাৎ, গরম পানি সরাসরি বলিরেখা তৈরি না করলেও ত্বকের শুষ্কতা বাড়িয়ে বিদ্যমান সূক্ষ্ম রেখাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
মুখ ধোয়ার জন্য কেমন পানি ব্যবহার করবেন?
মুখ পরিষ্কারের জন্য খুব গরম বা বরফঠান্ডা পানির পরিবর্তে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করাই ভালো। পানি এমন তাপমাত্রার হওয়া উচিত, যাতে ত্বকে অস্বস্তি না হয়।
গোসলের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানি অনেকের জন্য আরামদায়ক হতে পারে। তবে ত্বকের ধরন ও ব্যক্তিভেদে সহনশীলতা আলাদা হতে পারে। মুখ ধোয়ার পর ত্বক লাল হয়ে গেলে, টানটান লাগলে বা জ্বালাপোড়া করলে পানির তাপমাত্রা কমানো প্রয়োজন।
কতক্ষণ মুখ ধোয়া উচিত?
পানির তাপমাত্রার পাশাপাশি মুখ পরিষ্কারের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে গরম পানির সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের শুষ্কতা বাড়তে পারে। আবার জোরে ঘষে মুখ পরিষ্কার করলেও ত্বকে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
তাই অল্প সময়ের মধ্যে আলতোভাবে মুখ পরিষ্কার করা উচিত। ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষে না মুছে আলতো করে চেপে পানি শুষে নিতে হবে। এরপর ত্বক সামান্য আর্দ্র থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সুবিধা হয়।
ঠান্ডা পানি কি ত্বকের জন্য বেশি উপকারী?
ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুলেই ত্বক সুস্থ থাকবে বা বয়সের ছাপ কমবে—এমন কোনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠান্ডা পানি লোমকূপ বন্ধ করে দেয় বা ত্বকে বার্ধক্যরোধী প্রভাব ফেলে বলে যেসব দাবি করা হয়, সেগুলোও পুরোপুরি সঠিক নয়। তাপমাত্রার পরিবর্তনে লোমকূপ দরজার মতো খুলে বা বন্ধ হয়ে যায় না।
ঠান্ডা পানি মুখে সতেজ অনুভূতি দিতে পারে এবং সাময়িকভাবে ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ত্বকের যত্নে অস্বস্তিকর ঠান্ডা পানি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
সব মিলিয়ে, ত্বকে বয়সের ছাপ এড়াতে শুধু পানির তাপমাত্রার ওপর নির্ভর না করে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। কুসুম গরম পানি, কোমলভাবে মুখ পরিষ্কার করা এবং নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার ত্বকের যত্নে সহায়ক হতে পারে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!