ঘুমানোর আগে শেষবারের মতো ফোন দেখা, আবার ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া—অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস এটি। কেউ বালিশের পাশে, কেউ বিছানার পাশের টেবিলে, আবার কেউ চার্জে বসিয়ে বিছানার কাছেই রাখেন ফোন। তবে রাতে ফোন ব্যবহারের এই অভ্যাস ঘুমের মান, মানসিক স্বস্তি ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফোন কাছে রাখলেই ক্যানসার বা গুরুতর কোনো রোগ হয়—এমন প্রমাণ বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখা, নোটিফিকেশনের কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং চার্জে থাকা ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়ার মতো ঝুঁকি এড়ানো জরুরি।
ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে নীল আলো
রাতে ফোন ব্যবহারের অন্যতম উদ্বেগ হলো ঘুমের ওপর এর প্রভাব। মোবাইলের পর্দা থেকে নির্গত আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শে ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে।
ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি, ভিডিও দেখা কিংবা বার্তা পড়ার কারণে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। শুধু আলো নয়, ফোনের আকর্ষণীয় বিষয়বস্তুও মস্তিষ্ককে সজাগ রাখতে পারে।
এ সমস্যা কমাতে ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং শোবার ঘরে আলো কম রাখাও সহায়ক।
নোটিফিকেশনে ভাঙতে পারে ঘুম
ফোন ব্যবহার না করলেও কল, বার্তার শব্দ কিংবা ভাইব্রেশন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এসব কারণে বারবার ঘুম ভাঙলে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ফোন হাতের কাছে থাকলে রাতে ঘুম ভাঙার পর বার্তা দেখার প্রবণতাও বাড়তে পারে। এতে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা কঠিন হয়।
এ ক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে ফোনের ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বা ‘সাইলেন্ট’ মোড চালু রাখা যেতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কলের অনুমতি রেখে ফোনটি বালিশ থেকে কিছুটা দূরে রাখলে বারবার ফোন দেখার প্রবণতা কমতে পারে।
ফোনের বিকিরণ নিয়ে কী বলছে বিজ্ঞান?
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (আরএফ) শক্তি নির্গত হয়। এটি একধরনের নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ। এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং বিকিরণের তুলনায় এ ধরনের বিকিরণের শক্তি কম এবং এটি সরাসরি একইভাবে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না।
মোবাইল ফোনের বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে এই শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ এই নয় যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে ক্যানসার হয়; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি নাকচ করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী গবেষণাগুলোতেও মোবাইল ফোন ব্যবহার ও ক্যানসারের মধ্যে নিশ্চিত কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একইভাবে, শুধু বিছানার পাশে ফোন রেখে ঘুমানোর কারণে ক্যানসার হয়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণও নেই।
তবু বিকিরণের সংস্পর্শ কমাতে ফোন কিছুটা দূরে রাখা, কথা বলার সময় স্পিকার ব্যবহার করা কিংবা প্রয়োজন না থাকলে এয়ারপ্লেন মোড চালু রাখার মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
বালিশের নিচে ফোন চার্জ দেওয়া বিপজ্জনক
বালিশের পাশে ফোন রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তার বিষয়গুলোর একটি হলো চার্জ দেওয়ার সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। ফোন বালিশ, কম্বল বা তোশকের নিচে রেখে চার্জ দিলে তাপ বের হতে বাধা পেতে পারে। এতে ফোন ও ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি, ত্রুটিপূর্ণ চার্জার কিংবা নষ্ট তার এ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। পরিস্থিতিভেদে অতিরিক্ত তাপ থেকে পুড়ে যাওয়া বা আগুন লাগার ঘটনাও ঘটতে পারে।
তাই ফোন চার্জ দেওয়ার সময় বিছানার চাদর ও অন্যান্য দাহ্য বস্তু থেকে দূরে শক্ত, সমতল এবং বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখা উচিত। উপযুক্ত চার্জার ব্যবহার করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি বা তার দিয়ে চার্জ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বালিশ কিংবা তোশকের নিচে ফোন চার্জ দেওয়া উচিত নয়।
গভীর রাতে ফোন ব্যবহার মানসিক চাপ বাড়াতে পারে
বিছানার পাশে ফোন থাকলে গভীর রাতেও কাজের ই-মেইল, খবর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। মন খারাপ করা খবর, কাজের বার্তা কিংবা অন্যদের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার অভ্যাস মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
ফোন কাছে থাকলেই যে উদ্বেগ বা বিষণ্নতা তৈরি হবে, তা নয়। তবে রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে এবং ঘুমের মান খারাপ করতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চলতে থাকলে তা সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ সমস্যা এড়াতে রাতে ফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা যেতে পারে। ঘুমানোর আগে বই পড়া, শান্ত সংগীত বা অডিও শোনা কিংবা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার মতো আরামদায়ক অভ্যাস গড়ে তোলাও উপকারী হতে পারে।
ফোন রাখার অভ্যাসে আনুন ছোট পরিবর্তন
ঘুমের সময় ফোন একেবারে দূরে রাখতেই হবে, এমন নয়। তবে ঘুমের ব্যাঘাত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি অভ্যাস কাজে আসতে পারে—ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার সীমিত করা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, ফোন বালিশের নিচে না রাখা এবং চার্জ দেওয়ার সময় নিরাপদ জায়গা বেছে নেওয়া।
ছোট এসব পরিবর্তন রাতের ঘুমকে আরও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এবং স্বাস্থ্যকর ঘুমের রুটিন গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!