চুলের যত্নে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। তবে কত দিন পরপর চুল ধোয়া উচিত, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। কেউ প্রতিদিন শ্যাম্পু করেন, আবার কেউ সপ্তাহে এক বা দুইবার চুল ধুয়ে থাকেন। আসলে চুল ধোয়ার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই।
মাথার ত্বকের ধরন, চুলের গঠন, ঘাম, তেল উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে চুল পরিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা। সাধারণভাবে, অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রতি দুই থেকে তিন দিনে একবার বা সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার চুল ধোয়া ভালো সূচনা হতে পারে। তবে মাথার ত্বক দ্রুত তৈলাক্ত হয়ে গেলে আরও ঘন ঘন চুল ধোয়ার প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, শুষ্ক ও কোঁকড়ানো চুলের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ঘন ঘন শ্যাম্পু করাই ভালো হতে পারে।
চুল কখন ধোয়া প্রয়োজন, তা বুঝতে মাথার ত্বকের অবস্থার দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। চুল তৈলাক্ত হয়ে গেলে, ঘাম জমলে, ময়লা আটকে থাকলে বা মাথার ত্বকে অস্বস্তি দেখা দিলে চুল ধোয়া উচিত।
মাথার ত্বকের ধরন বুঝে চুল ধোয়ার নিয়ম
তৈলাক্ত মাথার ত্বক
যাঁদের মাথার ত্বক দ্রুত তৈলাক্ত হয়ে যায়, তাঁদের প্রতিদিন বা এক দিন পরপর চুল ধোয়ার প্রয়োজন হতে পারে। অতিরিক্ত তেল চুলকে চ্যাপ্টা ও নিষ্প্রাণ করে দিতে পারে। পাশাপাশি মাথার ত্বকে ধুলাবালি ও প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশ জমতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী মৃদু শ্যাম্পু বেছে নেওয়া ভালো। প্রতিদিন চুল ধুলেও যদি মাথার ত্বকে শুষ্কতা বা অস্বস্তি না হয়, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এই অভ্যাস চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
শুষ্ক মাথার ত্বক
মাথার ত্বক শুষ্ক হলে টানটান ভাব, চুলকানি কিংবা অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে শক্তিশালী উপাদানযুক্ত শ্যাম্পু দিয়ে ঘন ঘন চুল ধুলে এসব সমস্যা বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে চুল ধোয়ার ব্যবধান বাড়িয়ে দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি মৃদু ও আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়ক শ্যাম্পু ব্যবহার করা ভালো। তবে দীর্ঘদিন চুলকানি, লালচে ভাব বা ত্বকে আঁশ ওঠার সমস্যা থাকলে সেটিকে শুধু শুষ্কতা ভেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। এসব লক্ষণ অন্য কোনো ত্বকের সমস্যার কারণেও হতে পারে।
কোঁকড়ানো ও কুঁচকানো চুল
কোঁকড়ানো ও কুঁচকানো চুলে শুষ্কতা এবং চুল ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এ ধরনের চুলে মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল পুরো চুলে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে।
তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সপ্তাহে এক বা দুইবার চুল ধোয়া যেতে পারে। চুলের শুষ্কতা কমাতে শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করা উপকারী। তবে চুলের ধরন ও মাথার ত্বকের অবস্থার ভিত্তিতে ধোয়ার ব্যবধান ঠিক করা উচিত।
খুশকির সমস্যা থাকলে
খুশকি থাকলে মাথার ত্বকের তেল নিয়ন্ত্রণ ও খুশকির আঁশ দূর করতে নিয়মিত চুল ধোয়া প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিটোকোনাজল বা সেলেনিয়াম সালফাইডযুক্ত বিশেষ শ্যাম্পু ব্যবহার করা যায়। তবে শ্যাম্পু ব্যবহারের আগে পণ্যের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে শ্যাম্পু কতক্ষণ মাথার ত্বকে রাখতে হবে, তা মেনে চলতে হবে। ব্যবহারের পরও খুশকি না কমলে বা সমস্যা বেড়ে গেলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিদিন চুল ধুলে কি চুল পড়ে?
প্রতিদিন চুল ধুলেই চুল পড়ে যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। শ্যাম্পু করার সময় যেসব চুল ঝরে পড়ে, সেগুলোর অনেকগুলোই স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়ার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। চুল ধোয়ার সময় সেগুলো চোখে বেশি পড়তে পারে।
তবে চুলে অতিরিক্ত জোরে ঘষাঘষি করা, তোয়ালে দিয়ে জোরে মোছা কিংবা ঘন ঘন হেয়ার ড্রায়ার ও স্ট্রেইটনার ব্যবহার করলে চুল ভেঙে যেতে পারে। তাই চুল ধোয়ার সময় মাথার ত্বকে আলতোভাবে শ্যাম্পু ম্যাসাজ করা এবং ভেজা চুলের যত্ন নেওয়া জরুরি।
চুল অতিরিক্ত ঝরতে থাকলে, মাথার কোনো অংশে টাক দেখা দিলে বা চুলের সিঁথি ক্রমে চওড়া হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চুল ধোয়ার সঠিক পদ্ধতি
চুল পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি এর স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও গঠন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য কয়েকটি বিষয় মেনে চলতে পারেন—
উপযুক্ত শ্যাম্পু বেছে নিন: মাথার ত্বক ও চুলের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
মাথার ত্বকে আলতোভাবে ম্যাসাজ করুন: চুলের পুরো দৈর্ঘ্যে জোরে ঘষাঘষি না করে মাথার ত্বক পরিষ্কারে মনোযোগ দিন।
হালকা গরম পানি ব্যবহার করুন: খুব গরম পানি মাথার ত্বকের শুষ্কতা ও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
কন্ডিশনার ব্যবহার করুন: বিশেষ করে শুষ্ক বা জট পাকানো চুলের ক্ষেত্রে চুলের মাঝখান থেকে আগা পর্যন্ত কন্ডিশনার লাগান।
আলতোভাবে চুল শুকান: তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষার পরিবর্তে চুল চেপে চেপে পানি শুষে নিন।
প্রতিবার চুল ধোয়ার সময় দুইবার শ্যাম্পু করার প্রয়োজন নেই। তবে মাথার ত্বক খুব তৈলাক্ত হলে কিংবা চুলে অনেক প্রসাধনী জমে থাকলে দ্বিতীয়বার শ্যাম্পু করা যেতে পারে।
নিয়মিত চুল না ধুলে কী হতে পারে?
দীর্ঘ সময় চুল পরিষ্কার না করলে মাথার ত্বকে তেল, ঘাম, মৃত কোষ ও প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশ জমতে পারে। এতে চুলকানি, দুর্গন্ধ ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে খুশকির সমস্যাও বেড়ে যেতে পারে।
তবে কত দিন চুল না ধুলে তা অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে, এর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। কারও মাথার ত্বকে এক দিনেই তেল জমে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন পর চুল ধোয়ার প্রয়োজন হয়।
তাই নির্দিষ্ট দিন গুনে নয়, মাথার ত্বক ও চুলের প্রয়োজন বুঝেই চুল ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। এতে মাথার ত্বক পরিষ্কার ও আরামদায়ক রাখার পাশাপাশি চুলের শুষ্কতা ও ক্ষতির ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!