বিবাহিত জীবনে দুজন মানুষের অভ্যাস, মতামত ও প্রত্যাশার মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। এ কারণে কখনো মতবিরোধ, হতাশা কিংবা মনোমালিন্যও হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের প্রায় প্রতিটি বিরোধ যদি শেষ পর্যন্ত একজনের দোষ খোঁজার বিষয়ে গিয়ে ঠেকে, তাহলে বিষয়টি ভাবনার কারণ হতে পারে।
কিছু মানুষের মধ্যে সব সময় প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। তাঁরা সমালোচনা সহজে মেনে নিতে পারেন না এবং সঙ্গীর অনুভূতিকেও খুব একটা গুরুত্ব দেন না। এমন আচরণে অন্য সঙ্গী নিজেকে উপেক্ষিত, মানসিকভাবে ক্লান্ত এবং নিজের সিদ্ধান্ত ও অনুভূতি নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়তে পারেন।
নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (এনপিডি) একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। তবে কারও মধ্যে নার্সিসিস্টিক বা আত্মকেন্দ্রিক কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেই তাঁকে এই রোগে আক্রান্ত বলা যায় না। রোগ নির্ণয়ের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন। দাম্পত্য সম্পর্কে এমন আচরণের পাঁচটি লক্ষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. প্রতিটি মতবিরোধের দায় শেষ পর্যন্ত আপনার ওপর পড়ে
আপনি হয়তো স্বামীর কোনো আচরণে কষ্ট পেয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে দেখা গেল, নিজের আচরণের ব্যাখ্যা দিতেই আপনাকে বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। স্বামী আলোচনার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে আপনার পুরোনো ভুল সামনে আনতে পারেন কিংবা নিজের দায় স্বীকার করতে অস্বীকার করতে পারেন।
এমন পরিস্থিতি বারবার ঘটলে একসময় আপনি কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলাই এড়িয়ে চলতে পারেন। কারণ, আগে থেকেই মনে হতে পারে, আলোচনা শেষ পর্যন্ত আপনার দোষ খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
২. নিজে প্রশংসা চান, কিন্তু আপনাকে মূল্যায়ন করেন না
সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কে দুজনেরই একে অপরের প্রচেষ্টা ও অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। কিন্তু নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কেউ সব সময় নিজের প্রশংসা, মনোযোগ ও স্বীকৃতি আশা করতে পারেন। অথচ সঙ্গীর সাফল্য বা প্রচেষ্টাকে যথাযথ গুরুত্ব দেন না।
আপনার অর্জনকে তুচ্ছ করা, ভালো কাজের স্বীকৃতি না দেওয়া কিংবা আপনার সুখবরকে নিজের সাফল্যের গল্প বলার উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করার মতো আচরণ দেখা যেতে পারে। ফলে সম্পর্কে মনে হতে পারে, কেবল একজনের চাহিদা ও স্বীকৃতি পাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন না
স্বামীর কোনো কথায় কষ্ট পেলে আপনি হয়তো তা তাঁকে জানালেন। কিন্তু তিনি যদি আপনার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা না করে আপনাকে অতিরিক্ত সংবেদনশীল বলে মন্তব্য করেন কিংবা বিষয়টিকে অযথা বড় করে দেখছেন বলে উড়িয়ে দেন, তাহলে সেটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এ ধরনের আচরণ বারবার ঘটলে নিজের অনুভূতি নিয়েই সন্দেহ তৈরি হতে পারে। আপনি ভাবতে শুরু করতে পারেন, আপনার কষ্ট পাওয়া বা কোনো বিষয়ে আপত্তি জানানো আদৌ যুক্তিসংগত কি না।
৪. ঝগড়ার পর নীরব থেকে আপনাকে শাস্তি দেন
মতবিরোধের পর শান্ত হওয়ার জন্য কিছুটা সময় নেওয়া স্বাভাবিক। তবে বারবার কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া, স্নেহ বা যোগাযোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা কিংবা আপনি নতি স্বীকার না করা পর্যন্ত উপেক্ষা করা ভিন্ন বিষয়।
কেউ যদি নীরবতাকে সঙ্গীকে শাস্তি দেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে সম্পর্কে অস্বাস্থ্যকর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মানসিক দূরত্ব এড়াতে আপনি নিজের বিশ্বাস বা মতের বিরুদ্ধে গিয়েও তাঁর সঙ্গে একমত হতে বাধ্য বোধ করতে পারেন।
৫. আপনার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেন না
বিয়ের পর দুজনের সব বিষয়ে একমত হওয়া কিংবা একই বন্ধু ও আগ্রহ ভাগ করে নেওয়া জরুরি নয়। প্রত্যেকেরই নিজস্ব পরিচয়, পছন্দ ও ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক বা নিয়ন্ত্রণপ্রবণ স্বামী আপনার স্বাধীন সিদ্ধান্ত, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সহজে মেনে নিতে না-ও পারেন। আপনার পছন্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, ব্যক্তিগত সীমারেখা বজায় রাখার জন্য অপরাধবোধ তৈরি করা কিংবা নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চাপ দেওয়ার মতো আচরণ দেখা যেতে পারে।
এভাবে সময়ের সঙ্গে আপনার মনে হতে পারে, নিজের জীবনের সাধারণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন।
মনে রাখবেন
এসব আচরণের এক বা একাধিকটি দেখা গেলেই কাউকে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বলা যায় না। তবে আচরণগুলো নিয়মিত ঘটলে এবং আপনার মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেললে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
No comments yet. Be the first to comment!