ঢাকার ভাটারা এলাকার সরু গলিতে ঢুকতেই কানে আসে টুংটাং শব্দ। এক পাশে হাঁপড় টেনে আগুন জ্বালাচ্ছেন একজন কারিগর, অন্য পাশে লাল টকটকে হয়ে ওঠা লোহার ওপর পড়ছে ভারী হাতুড়ির ঘা। আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে চারপাশ ঝলসে উঠছে। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা। তৈরি হচ্ছে ছুরি, চাপাতি, দা ও বঁটি।
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে এলেই রাজধানীর কামারপট্টিগুলোতে বাড়ে ব্যস্ততা। বছরের অধিকাংশ সময় কাজের চাপ কম থাকলেও কোরবানির ঈদ ঘিরে কয়েক দিনের জন্য যেন প্রাণ ফিরে পায় এই পেশা। তবে কারিগরদের ভাষ্য, এবারও এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি বাজার। ঈদের পাঁচ থেকে সাত দিন আগে শুরু হবে আসল চাপ।
ভাটারার একটি কামারশালায় কাজ করছেন কমল সরকার। প্রায় এক দশক ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত তিনি। আগে বাড্ডায় কাজ করলেও এখন ভাটারাতেই দোকান চালান।
কমল সরকার বলেন, “সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কোরবানির আগে কয়েকটা দিনই আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এখনো চাপ কম, তবে সামনে কাজ বাড়বে।”
তবে ব্যস্ততার মধ্যেও স্বস্তি নেই কারিগরদের। কারণ, বেড়েছে উৎপাদন খরচ। রেলের লোহা ও পাথরের কয়লার দাম বাড়ায় আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ পড়ছে।
কমল বলেন, “লোহার দাম বাড়ছে, কয়লার দামও বাড়ছে। খরচ বাড়লেও লাভ খুব একটা বাড়ে না। দাম একটু না বাড়ালে টিকে থাকা কঠিন।”
তার দোকানে মাঝারি মানের চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। বড় ছুরির দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, চামড়া ছাড়ানোর ছোট ছুরি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। এছাড়া দা ও বঁটির দাম ৪০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।
কামারপট্টিতে এসেছিলেন বনানীর একটি বাসায় কর্মরত গাড়িচালক খায়রুল আলম। পুরোনো দা-ছুরি শান দিতে এসে তিনি বলেন, “গত বছরের জিনিসগুলো ধার করিয়ে নিচ্ছি। কিছু নতুনও কিনব। তবে এবার সবকিছুর দামই বেশি মনে হচ্ছে।”
কামারদের অভিযোগ, শুধু কাঁচামালের দাম বাড়াই নয়, বিদেশি রেডিমেড পণ্যও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার, শপিংমল কিংবা ফুটপাত—সবখানেই এখন সহজে মিলছে বিদেশি তৈরি দা, ছুরি ও চাপাতি। চকচকে ফিনিশিং ও তুলনামূলক কম দামের কারণে অনেক ক্রেতাই সেদিকে ঝুঁকছেন।
ভাটারার আরেক কারিগর উত্তম কুমার বলেন, “এই পেশা আমাদের বাপ-দাদার। কিন্তু এখন বাজার ভরে গেছে বিদেশি জিনিসে। মানুষ বাহারি জিনিস দেখে কিনে নেয়। হাতে তৈরি জিনিস যে অনেক বেশি টেকসই, সেটা অনেকেই বোঝেন না।”
তিনি বলেন, “কোরবানির সময় কিছু কাজ পাই। কিন্তু বছরের বাকি সময় খুব কষ্টে চলতে হয়। এখন টিকে থাকাই বড় লড়াই।”
হাঁপড়ে জ্বলা আগুন, লাল হয়ে ওঠা লোহা আর হাতুড়ির ছন্দ—এসব শুধু একটি পেশার দৃশ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পুরোনো এক ঐতিহ্য। কিন্তু আধুনিক বাজারব্যবস্থা ও বিদেশি পণ্যের ভিড়ে সেই ঐতিহ্য এখন টিকে থাকার কঠিন সংগ্রামে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!